দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়। সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় অবিভক্ত বাংলার বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের ভূমিকা জাপানের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। জাপানের প্রতি তাঁর এই অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের বন্ধুত্ব নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।
১৯৪৬ সালে জাপানের টোকিওতে আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জাপানি নেতাদের বিচার শুরু হয়। ওই ট্রাইব্যুনালের অন্যতম বিচারক ছিলেন বাংলার কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল। ১৯৪৮ সালে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে অভিযুক্ত নেতাদের খালাস দেওয়ার পক্ষে পৃথক মতামত দেন। তাঁর এই অবস্থান জাপানে তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। তবে তাঁর রায়ের ফলে জাপানি সৈন্যদের শাস্তি কমানো হয়েছিল—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন, খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপান সহযোগিতা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
এই সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার জাইকা (JICA), জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা। ১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশে জাইকার উন্নয়ন সহযোগিতার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপান বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে আসছে। ঢাকার মেট্রোরেলসহ বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পেও রয়েছে জাপানের সহায়তা।
তাহলে জাপান কেন বাংলাদেশকে এত সাহায্য করে? এর পেছনে কি রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, নাকি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও উন্নয়ন অংশীদারত্বই এর মূল কারণ?
বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের ঐতিহাসিক ভূমিকা জাপানে আজও আলোচিত। তবে তাঁর রায়ের কৃতজ্ঞতা থেকেই জাইকা বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহযোগিতার নথিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাপান ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাসে বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের ভূমিকা একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। আর জাইকার দীর্ঘদিনের সহযোগিতা দুই দেশের বন্ধুত্ব ও উন্নয়ন অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
/কানিজ/মোতাহার

