ডিআইইউ প্রতিনিধি:
জার্মানিতে পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। কিন্তু ভিসা জটিলতা, কাঙ্ক্ষিত ইউরোপীয় বৃত্তিতে প্রত্যাখ্যান এবং অনিশ্চয়তার নানা বাঁক পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একাধিক আন্তর্জাতিক বৃত্তি অর্জন করেছেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের (বিবিএ–পি-১১৯) শিক্ষার্থী মো. রিফাত আহমেদ। সবদিক বিবেচনা করে তিনি এখন সৌদি আরব সরকারের পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে জাযান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ছিল রিফাতের অনেক দিনের। শুরু থেকেই তার প্রথম পছন্দ ছিল ইউরোপের দেশ জার্মানি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলক কম ব্যয়ে পড়াশোনার সুযোগ থাকায় তিনি শুরু থেকেই নিজেকে সেই লক্ষ্যেই প্রস্তুত করতে থাকেন। বাবা-মায়ের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না দিয়ে বৃত্তি বা স্বল্প ব্যয়ে বিদেশে পড়াশোনা করার পরিকল্পনাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।
সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে জার্মান ভাষা কোর্সে ভর্তি হন। কিন্তু জার্মানির শিক্ষার্থী ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন। পরে জার্মানির প্রশিক্ষণভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা ‘আউসবিল্ডুং’ সম্পর্কে জানার পাশাপাশি বিকল্প গন্তব্য হিসেবে রোমানিয়াকে বেছে নেন।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বৃত্তির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগে অংশ নিয়ে নিজের প্রোফাইল সমৃদ্ধ করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষা ও এসএটি পরীক্ষার প্রস্তুতিও নেন।
রিফাতের প্রথম আবেদন ছিল রাশিয়া সরকারের বৃত্তিতে। এরপর একে একে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বৃত্তির জন্য আবেদন করেন। তবে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। ইউরোপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় ‘স্টাইপেন্ডিয়াম হাঙ্গারিকাম’ বৃত্তিতে নির্বাচিত না হওয়া ছিল তার জন্য বড় ধাক্কা। তবে সেই ব্যর্থতাই তাকে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে রোমানিয়ার অন্যতম স্বনামধন্য ‘ইউনিভার্সিটি অব পলিটেকনিকা বুকারেস্ট’ থেকে ভর্তি প্রস্তাব পান তিনি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে টিউশন ফি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করলে তারা অতিরিক্ত সময় দেন।
ঠিক সেই সময়েই জীবনে আসে নতুন মোড়। টিউশন ফি জমা দিতে যাওয়ার দিন ঢাকাস্থ রাশিয়ান হাউস থেকে জানতে পারেন, তিনি রাশিয়া সরকারের বৃত্তির প্রথম ধাপে নির্বাচিত হয়েছেন। একদিকে রোমানিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, অন্যদিকে পূর্ণ বৃত্তির সুযোগ—দুইয়ের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত সে সময়ের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা বিবেচনা করে রাশিয়ায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপরও থেমে থাকেননি রিফাত। একের পর এক আন্তর্জাতিক বৃত্তির সাক্ষাৎকার, পরীক্ষা ও মূল্যায়নে অংশ নিতে থাকেন। তার অভিজ্ঞতায়, স্নাতক পর্যায়ে ইউরোপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণ বৃত্তির সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও অধ্যবসায় ও প্রস্তুতি থাকলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
এ পর্যন্ত তিনি রাশিয়া সরকার বৃত্তি, সৌদি আরব সরকার বৃত্তি, কাজাখস্তান সরকার বৃত্তি এবং ইন্দোনেশিয়ার বেংকুলু বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি অর্জন করেছেন। এছাড়া তুরস্ক বুরসলারি, দিনায়াত ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ–পাকিস্তান নলেজ করিডর, রোমানিয়া সরকার এবং আরাইস বৃত্তির ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে স্টাইপেন্ডিয়াম হাঙ্গারিকাম বৃত্তি ও আলবুখারি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় বৃত্তিতে নির্বাচিত হতে পারেননি।
সবদিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব সরকারের পূর্ণ বৃত্তি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এই বৃত্তির আওতায় রয়েছে সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ, বিনামূল্যে আবাসন, মাসিক ভাতা, এককালীন স্থায়ী হওয়ার অনুদান, প্রতিবছর যাতায়াতের বিমান টিকিট, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের বিমান টিকিট, স্বাস্থ্যবিমা এবং গ্রন্থাগারসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সুবিধা।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে তিনি সৌদি আরবের জাযান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করবেন। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ৪০১–৫০০-এর মধ্যে।
নিজের এই দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রিফাত বলেন, “জীবনে কখনো থেমে গেলে চলবে না। একটি সুযোগ হাতছাড়া হলে আরেকটি সুযোগ তৈরি করতে হবে। ব্যর্থতা কখনো শেষ নয়; বরং নতুনভাবে শুরু করার অনুপ্রেরণা। আর বাবা-মায়ের দোয়া ও সমর্থনের বিকল্প কিছুই নেই। স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

