বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ভারতে চলে যান। গত দুই বছরে তাদের অনেকে কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করেছেন। কেউ কেউ পরে ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও চলে গেছেন। তবে ভারতে থাকা নেতাদের বড় একটি অংশ এখনও নিজেদের পরিচয় ও অবস্থান গোপন রেখেই দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ৭০ জন নেতা অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় থাকেন। এছাড়া পুলিশের প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তাও সেখানে রয়েছেন বলে জানা গেছে। একসময় সাবেক সংসদ সদস্য, সহযোগী সংগঠনের নেতা, পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাসহ প্রায় ২০০ জন কলকাতা ও আশপাশে অবস্থান করতেন।ভারতে থাকা নেতাদের অনেকেই আত্মীয় ও বন্ধুদের সহায়তায় জীবনযাপন করছেন বলে জানিয়েছেন। তাদের অনেকে আগের মতো আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নন। কেউ ভাড়া বাসায় একা থাকছেন, আবার কয়েকজন মিলে একটি বাসাও ভাড়া নিয়েছেন। অনেকের পরিবার তাদের সঙ্গে নেই। ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে ট্যাক্সি ও গণপরিবহন ব্যবহার করছেন বলেও কয়েকজন দাবি করেছেন।
তবে শুরুটা তাদের জন্য সহজ ছিল না। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, ভারতে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস তারা আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। অনেকেই এক বাসা থেকে অন্য বাসায় অবস্থান বদল করেছেন। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাসায় থেকেছেন। নিরাপত্তার কারণে ফোন ব্যবহারেও সতর্ক ছিলেন তারা।ভারতে অবস্থান করেও আওয়ামী লীগের নেতারা রাজনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন। ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন কমিটি পুনর্গঠন, মামলায় সহায়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর কাজ করছেন বলে তারা দাবি করেছেন।কলকাতা ও আশপাশে থাকা নেতারা নিজেদের মধ্যেও নিয়মিত যোগাযোগ ও বৈঠক করেছেন। একসময় কলকাতার কাছে একটি বাণিজ্যিক অফিস ভাড়া নিয়ে সেখানে বৈঠক করতেন কয়েকজন নেতা। তারা সেটিকে দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। পরে সেটি আর ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে আওয়ামী লীগের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।
শেখ হাসিনার সঙ্গেও গত দুই বছরে আওয়ামী লীগের নেতাদের যোগাযোগ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা। প্রথম বছর সরাসরি দেখা করার ঘটনা খুব বেশি না থাকলেও পরে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছোট ছোট দলে দিল্লিতে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছেন বলে জানা গেছে।
দলটির কয়েকজন নেতা এখন দেশে ফেরার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এরপর ভারতে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদের কয়েকজনও দেশে ফিরে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার মানসিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
তবে তাদের অনেকে এখনও ভারতে থাকলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। দেশে ফিরলে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা তারা বুঝতে পারছেন বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজেদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে দেশে ফিরে আইনি লড়াই করার কথাও বলেছেন কয়েকজন নেতা।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি দলীয় কার্যক্রমেই সম্পৃক্ত ছিলাম। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও সেখানে প্রতিবেদন প্রেরণ ইত্যাদি কাজগুলো করেছি।
নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলছিলেন, বাংলাদেশে আমাদের যে নেতা-কর্মীরা আছেন, তারাই তো মূল শক্তি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা, যেসব মামলা চলছে তাতে সহায়তা দেওয়া এসব করতেই দিন কেটে যায়। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণার কাজ তো আছেই।
তিনি আরও বলেন, মানসিক আর পারিবারিকভাবে আমি এবং আমরা দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুত। রোডম্যাপটা তৈরি, এখন অপেক্ষা করছি টাইমলাইনের জন্য।
শেখ হাসিনাও দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু কবে, কীভাবে তিনি দেশে ফিরবেন, সে ব্যাপারে কিছু প্রকাশ করেননি তিনি।

