মানুষ সাধারণত চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখেন। কিন্তু মোহাম্মদ অহিদ দেখেন স্পর্শে, অনুভবে আর জীবনের কঠিন বাস্তবতায়।
ভোর থেকে শুরু জীবনযুদ্ধের সংগ্রাম। দুই চোখে আলো নেই।তবু প্রতিদিন ভোরে নিজ হাতে বাদাম, ছোলা, শিমের বিচি আর চাল ভাজার কাজ শুরু করেন।
সকাল হতেই বেরিয়ে পড়েন জীবিকার সন্ধানে।চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের ব্যস্ত ফুটপাতে টানা ১২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বিক্রি করেন সেগুলো। দিন শেষে যে আয় হয়, তার বড় একটি অংশ চলে যায় চিকিৎসার খরচে।তবু থেমে থাকার কথা ভাবেন না তিনি। কারণ, তাঁর কাছে পরিশ্রমই সম্মান, আর সংগ্রামই জীবন। ভিক্ষাবৃত্তি বাদ দিয়ে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যই এ পথ বেছে নিয়েছেন বৃদ্ধ মানুষটি।
কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতি ইউনিয়নের লোকমানখারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ অহিদ। প্রায় ২০ বছর আগে জীবিকার তাগিদে চট্টগ্রামে চলে আসেন তিনি। নগরের ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। সেখানেই তৈরি করেন বাদামসহ বিক্রির সবকিছু। ষাটোর্ধ্ব অহিদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। বয়সের ভার আর শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও সংসারের দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি।
জন্ম থেকেই চোখে কম দেখার সমস্যা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃষ্টিশক্তি আরও লোপ পায়। এখন দুই চোখে কিছুই দেখতে পান না। কিন্তু এই অন্ধত্ব তাঁকে ঘরে বসিয়ে রাখতে পারেনি। বরং নিজের শ্রম আর সততার ওপর ভর করেই তিনি জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিদিন সকাল ১১টার দিকে ঘর থেকে বের হন অহিদ। এরপর টানা রাত ১১টা পর্যন্ত চলে কর্মব্যস্ততা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও এপিক হেলথ কেয়ারের সামনে বাদাম, ছোলা, শিমের বিচি ও চালভাজা বিক্রি করেন তিনি। দিন শেষে আয় হয় প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। এই আয় দিয়েই চলে সংসারের খাবার ও অন্যান্য খরচ।
অহিদের সংগ্রামের আরেকটি দিক আরও বিস্ময়কর। তিনি শুধু বিক্রি করেন না, বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় সব পণ্য নিজেই প্রস্তুত করেন। কাঁচা বাদাম ভাজা, ছোলা তৈরি, শিমের বিচি ও চালভাজা বানানো-সবকিছুই নিজের হাতে করেন। চোখে দেখতে না পেলেও বছরের পর বছর ধরে স্পর্শ, অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাসই তাঁর সবচেয়ে বড় সহায়।শনিবার (১ আগস্ট) রাত সাড়ে দশটা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন এপিক হেলথ কেয়ারের সামনে মোহাম্মদ অহিদের সঙ্গে কথা হয় বাংলানিউজের। তিনি বলেন, ‘জন্ম থেকেই চোখে কম দেখতাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন আর দেখতে পাই না। কিন্তু কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে? তাই যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন কাজ করে যেতে চাই’।
এই কথাগুলোই যেন তাঁর জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি। তিনি দয়া বা করুণার ওপর নির্ভর করতে চান না। মানুষের সহানুভূতি তাঁকে স্পর্শ করলেও সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান নিজের পরিশ্রমের উপার্জনে। প্রতিদিন শত শত মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তিনি নীরবে শিখিয়ে দেন-সৎ উপার্জনের মর্যাদা কত বড়।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে তাঁর অনেক নিয়মিত ক্রেতা রয়েছেন। কেউ বাদাম কিনতে এসে খোঁজ নেন, কেউ দু-একটি কথা বলেন। এই ভালোবাসাই যেন তাঁকে প্রতিদিন নতুন করে পথ চলার সাহস জোগায়।
সমাজে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও সহায়ক পরিবেশ এখনও যথেষ্ট নয়। সেই বাস্তবতায় মোহাম্মদ অহিদের জীবন এক অনুপ্রেরণার নাম। দুই চোখে আলো না থাকলেও তাঁর মনোবল অটুট।
ব্যস্ত নগরজীবনের অসংখ্য মুখের ভিড়ে মোহাম্মদ অহিদ হয়তো একজন সাধারণ বাদাম বিক্রেতা। কিন্তু তাঁর জীবনগল্প অসাধারণ। প্রতিদিনের ঘাম, শ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তিনি লিখে চলেছেন সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও আশার এক অনন্য উপাখ্যান।দৈনিক এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা আয় হলেও তার সবটুকু পরিবারের জন্য ব্যয় করার সুযোগ হয় না। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পাশাপাশি বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যায়ও ভুগছেন অহিদ। প্রতি সপ্তাহেই চোখ ও অন্যান্য রোগের চিকিৎসার পেছনে খরচ হয় এক হাজার টাকারও বেশি। সীমিত আয়ের বড় একটি অংশ চিকিৎসায় ব্যয় হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। তবুও চিকিৎসা বন্ধ করেন না। কারণ, শরীর যতটুকু সাড়া দিচ্ছে, ততদিন নিজের পরিশ্রমেই জীবিকা নির্বাহ করতে চান তিনি।

