জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে জনগণের কষ্ট হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জনগণের কাছে ‘কাইন্ডনেস’ বা সহনশীলতা প্রত্যাশা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমলেও অপরিশোধিত তেলের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে সরকারের ওপর বড় ধরনের ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে।মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিশ্ববাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি খাতেও সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জনগণের কষ্ট হচ্ছে, হবে। জনগণের কাছে সহনশীলতা চাই। কারণ কত ভর্তুকি সরকারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব?’তার ভাষ্য, প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হলে বছরে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে।গ্যাস সংকটের কারণে বেশি দামে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, এর ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ দ্রুত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অর্থবছরের মাত্র আড়াই মাসের মধ্যেই এর প্রায় অর্ধেক অর্থ দেওয়া হয়েছে। একই হারে ভর্তুকি দিতে থাকলে অর্থবছর শেষে এ ব্যয় সোয়া এক লাখ থেকে দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, জ্বালানি খাতে বিপুল ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য ব্যয়ও ভারসাম্যের মধ্যে রাখতে হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘১০-১১ বছর হলো তাদের বেতন স্কেল রিভাইজড হয়নি। যে কারণে এটিও সরকারের একটি প্রায়োরিটি।’ তবে পুরো বেতন কাঠামো একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, আগস্টে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা বর্তমানে কেটে গেছে। সংকটের আগে দেশে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ ছিল, বর্তমানে পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে গ্যাসের আমদানি নির্ভরতা কমানোর চেষ্টাও সরকার করছে বলে জানান তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিবহনে যৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে। সরকারের কাছে কল্যাণমূলক ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব খাতে একসঙ্গে ব্যয় করা কঠিন। তাই বিভিন্ন খাতের মধ্যে ভারসাম্য করতে হচ্ছে।
সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ফ্যামিলি কার্ডের অগ্রগতি জানিয়ে তিনি বলেন, এ কার্ডের জন্য একটি ডাটাবেইজ তৈরির কাজ চলছে। ধাপে ধাপে সবাইকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান জানান, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এছাড়া ওয়াল স্ট্রিট ও মেটার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশের বোয়িং কেনার প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, এটি একটি প্রকাশিত তথ্য এবং এ ধরনের একটি চুক্তি হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রীর সানফ্রান্সিসকো সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কোনো অনুষ্ঠান ছিল না; দলীয় বা অন্য একটি কর্মসূচি ছিল। পরে প্রধানমন্ত্রী সফর সংক্ষিপ্ত করেছেন। কম সময়ের সফরে ব্যয় সাশ্রয় হয় এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর দেশে থাকাকে সরকার বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, ‘এ মুহূর্তে কোন রাজনৈতিক সংকট দেখছে না সরকার। বিরোধী দলের লংমার্চ করছে, এক দফাও দিয়ে দিচ্ছে। এই সরকার ৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসেছে ও থাকবে, বিরোধী দলকে তা মেনে নিয়েই রাজনীতি করা উচিত। আওয়ামী লীগের কয়েকটা ককটেল বিস্ফোরণ করে কোনো সংকট তৈরি করা যাবে বলে মনে করি না।’

