আমার জন্ম এক অজপাড়া গাঁয়ে—যেখানে শহরের কোলাহল ছিল না, ছিল না ব্যস্ততার কোনো তাড়া। ছিল সবুজের বুক চিরে চলে যাওয়া মেঠোপথ, বর্ষায় কাদায় মাখামাখি রাস্তা, আর গ্রীষ্মে ধুলোর উড়ন্ত মেঘ। সেই মাটির গন্ধেই আমার শৈশবের প্রথম গল্প লেখা হয়েছিল।
বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান আমি। আমার পরে এক বোন, তারপর এক ভাই। দুজনের স্বভাব আলাদা, কিন্তু দুজনই ভীষণ মেধাবী। আর আমি—তাদের বড় ভাই, তুষার। হয়তো বড় হওয়ার আগেই বড় হয়ে যাওয়ার গল্পটা আমার জীবনেই লেখা ছিল।
বড় ছেলে হওয়ায় দায়িত্বটা ছোটবেলা থেকেই যেন আমার কাঁধে এসে বসেছিল। একসময় আব্বা আমাকে কাজ করতে বলতেন। কিন্তু বয়স যখন একটু একটু করে বাড়তে লাগল, তখন আব্বার মুখের কথার অপেক্ষায় থাকতাম না। নিজের ভেতরেই যেন একটা অদৃশ্য ডাক শুনতে পেতাম—কাজ করতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে।
আমি খুব মেধাবী ছাত্র ছিলাম না। বরং সহজ-সরল, কিছুটা বোকাসোকা স্বভাবের ছিলাম। পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পেলে ছাড়তাম না। বইয়ের পাতার চেয়ে কখনো কখনো বাইরের পৃথিবীটাই আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হতো।
বাবা-মায়ের মুখে কতটা হাসি ফুটাতে পেরেছি, জানি না। সত্যি বলতে, সেই হিসাব করলে হয়তো খাতাটা খুব বেশি পূর্ণ হবে না। তবুও আমার ভেতরে স্বপ্ন ছিল। অনেক স্বপ্ন। কিছু স্বপ্ন ছিল ঘুমের মধ্যে দেখা, আবার কিছু স্বপ্ন ছিল চোখ খোলা রেখেই দেখা।
ছোটবেলায় শিক্ষকদের মুখে শুনেছিলাম—মানুষ ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখে, সে স্বপ্ন বাস্তব হয় না। কিন্তু আরেক ধরনের স্বপ্ন আছে, যে স্বপ্ন মানুষ ঘুমিয়ে নয়, নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দিয়ে দেখে। সেই স্বপ্নই একদিন মানুষকে ঘুম ভাঙিয়ে বাস্তবের পথে হাঁটতে শেখায়।
তখন হয়তো কথাগুলোর গভীরতা বুঝতাম না। কিন্তু আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই কথাগুলোই হয়তো আমার ভেতরে কোথাও নীরবে বীজের মতো পড়ে ছিল।
আমার শৈশবটা ছিল আনন্দে ভরা। তখন ছোট ছোট জিনিসেই আনন্দ খুঁজে পেতাম। বিকেলের আকাশ, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, মাটির রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরা—এসবই ছিল আমাদের কাছে একেকটি উৎসব।
কিন্তু মানুষ যত বড় হয়, তার শৈশব তত দূরে সরে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, আনন্দগুলো যেন ধীরে ধীরে আমার হাত ফসকে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। যে শিশুটি একদিন কোনো চিন্তা ছাড়াই মাঠের ধারে ছুটে বেড়াত, একসময় তাকেই জীবনের হিসাব কষতে শিখতে হলো।
গ্রামে একটি প্রচলিত কথা আছে—বড় ছেলের ওপর নাকি পরিবারের অনেক দায়িত্ব এসে পড়ে। কথাটা তখন শুধু একটি প্রবাদ মনে হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, কিছু প্রবাদ আসলে মানুষের জীবন থেকেই জন্ম নেয়।
আমার পড়াশোনার শুরু অজপাড়া গাঁয়ের একটি স্কুলে। প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই পড়েছি। সেই স্কুল, সেই মাঠ, সেই মাটির গন্ধ—সবকিছু এখনো আমার স্মৃতির পাতায় কোথাও না কোথাও রয়ে গেছে।
এরপর আব্বা আমাকে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমি মজা করে সেই স্কুলটিকে বলতাম ‘জেলখানা স্কুল’। কারণ সেখানে পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। শৈশবের স্বাধীনতাকে যেন সেখানে নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখতে হতো।
প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে প্রায় তিন কিলোমিটার—কখনো একটু বেশি, কখনো একটু কম—পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতাম। পথটা ছিল কাঁচা। কাঁচা রাস্তা বলতে আজকের অনেকেই হয়তো ঠিক বুঝবেন না। সেটা ছিল মাটির রাস্তা—বর্ষা এলে যেখানে কাদা জমে পথ আর পথ থাকে না, হয়ে যায় পায়ের সঙ্গে লেগে থাকা এক দীর্ঘ পরীক্ষা।
আর গ্রীষ্ম এলে সেই একই রাস্তার চেহারা বদলে যেত। চারদিকে ধুলো উড়ত। কখনো মনে হতো, আমাদের ছোট্ট গ্রামটাই বুঝি কোনো এক সাহারা মরুভূমি হয়ে গেছে।
আব্বা আমাকে একটি সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। সেই সাইকেলটাই ছিল আমার প্রতিদিনের সঙ্গী। সকালে সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে স্কুলের পথে বের হতাম। পথ যতই কঠিন হোক, শিশুমনে তখন ক্লান্তির চেয়ে স্কুলে যাওয়ার অভ্যাসটাই বড় ছিল।
স্কুল শুরু হতো সকাল ৯টায়, ছুটি হতো বিকেল ৬টায়। এর ওপর আবার সেখানেই প্রাইভেট পড়তাম। ফলে দিনের বেশিরভাগ সময়ই স্কুলের চার দেয়ালের ভেতর কেটে যেত।
আম্মা প্রতিদিন আমাকে পাঁচ টাকা করে দিতেন। আজকের দিনে পাঁচ টাকা হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু তখন পাঁচ টাকা ছিল আমার কাছে ছোট্ট এক পৃথিবী। সেই টাকায় কত কিছু যে কেনা যেত, তার হিসাব আজ মনে করলে নিজের অজান্তেই হাসি পায়।
তবে আব্বার কাছে টাকা চাইতে আমার ভীষণ ভয় লাগত। আব্বাকে দেখলেই মনে হতো, যেন আমার সামনে কোনো সিংহ দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর কঠিন মুখের আড়ালে যে গভীর মায়া ছিল, সেটা তখন বুঝতাম না।
আর ভয় পেলেই আমি মায়ের আঁচলের আড়ালে লুকিয়ে যেতাম। মায়ের আঁচলটা ছিল আমার ছোট্ট পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। পৃথিবী যত বড়ই হোক, সেই আঁচলের নিচে লুকিয়ে থাকা শিশুটির কাছে তখন কোনো ভয়ই ভয় মনে হতো না।
এভাবেই কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলাম। এরপর ভর্তি হলাম এলাকার একটি নামকরা স্কুলে। তবে সেখানে ভর্তি হওয়ার আগে আমাকে একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছিল—পরীক্ষাটির নাম ছিল PSC। এখন আর সেই পরীক্ষা হয় না।
শৈশব পেরিয়ে তখন পা রেখেছি বয়ঃসন্ধিকালে। জীবনের এই সময়টা অদ্ভুত। শরীর বদলায়, মন বদলায়, চিন্তার জগতেও যেন এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে যায়। মনের ভেতর কত কথা যে দৌড়াতে থাকে, তার কোনো হিসাব থাকে না।
এই সময়টাতেই অনেকের জীবনে আসে প্রেম, আসে কোনো এক রমণীর উপস্থিতি। কারও অগোচরে, কারও প্রকাশ্যে—কেউ এসে বসে যায় মনের এক কোণে। কিন্তু আমার জীবনে তেমন কোনো রমণী আসেনি। কেন আসেনি, তা নিজেও জানি না। সত্যি বলতে, কখনো জানার চেষ্টাও করিনি।
তবে হ্যাঁ, জীবনে একজনকে ভালো লেগেছিল। নিঃশব্দে, কোনো দাবি ছাড়াই। তার চোখ দুটো ছিল হরিণের মতো মায়াবী। সেই চোখে কী এক অদ্ভুত টান ছিল—একবার তাকালে যেন চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করত না। তার চেহারায় ছিল এমন এক অপূর্ব মায়া, যা দেখলে মনে হতো, শুধু চোখ দুটো দিয়েই হয়তো অনেক গল্প বলা যায়।
তাকে দেখলেই মনটা কেমন যেন ভরে যেত। কোনো কথা বলার প্রয়োজন হতো না, কাছে যাওয়ারও নয়। দূর থেকে একবার দেখাই যেন সেদিনের জন্য যথেষ্ট ছিল।
তবু সেই ভালো লাগার কথা কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি। হয়তো সংকোচ ছিল, হয়তো আত্মমর্যাদাবোধ। মনে হতো, ভালো লাগার কথা বললেই যেন নিজের ভেতরের কোনো গোপন দরজা অন্যের সামনে খুলে দিতে হবে।
তাই কথাটা মনের মধ্যেই রেখে দিয়েছিলাম।
তবে এই গল্প শুধু আমার একার নয়। মানুষের জীবন এমনই। কারও জীবনে ভালোবাসা এসে দরজায় কড়া নাড়ে, কেউ সেই দরজা খুলে দেয়। আবার কারও জীবনে ভালোবাসা আসে না, কিংবা এলেও নীরবে ফিরে যায়। কিছু মানুষ ভালোবাসা পায়, আর কিছু মানুষ ভালোবাসার স্মৃতি নিয়েই বড় হয়।
সে কথা থাক।
এরপর এলো জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। PSC পরীক্ষা দিয়ে একটি নামকরা স্কুলে ভর্তি হলাম। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু—সবকিছু মিলিয়ে নিজের ভেতরে এক ধরনের আনন্দ কাজ করছিল। বাইরে থেকে দেখলে হয়তো আমার মুখেও সেই আনন্দের ছাপ ছিল।
কিন্তু আমার সেই আনন্দ বাবা-মায়ের মুখে দেখতে পেলাম না।
কারণ, আমি ভালো ফল করতে পারিনি।
একটি প্রবাদ আছে—‘বৃক্ষ তোমার পরিচয় কী? ফলে পরিচয়।’ মানুষের ক্ষেত্রেও যেন কথাটা সত্যি। গাছ যত বড়ই হোক, তার পরিচয় শেষ পর্যন্ত তার ফলেই প্রকাশ পায়। আমিও যেন সেই বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু আমার ফল বাবা-মায়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
নিজেকে তখন কেমন যেন অপরাধী মনে হতো।
মনে হতো, কেন আমি আরও ভালোভাবে পড়লাম না? কেন এত ফাঁকি দিলাম? কেন সময় থাকতে বুঝলাম না?
কিন্তু মানুষ অনেক কিছুই বোঝে সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর। চোর পালিয়ে যাওয়ার পর যেমন বুদ্ধি আসে, আমার অবস্থাটাও ছিল অনেকটা তেমন।
তখন মনে হতো, আমি যদি পড়াশোনায় এতটা ফাঁকিবাজি না করতাম, যদি একটু মন দিয়ে পড়তাম, তাহলে অন্তত বাবা-মায়ের মুখে সেই কাঙ্ক্ষিত হাসিটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারতাম।
সেই হাসির কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
টাকা দিয়ে বাড়ি বানানো যায়, টাকা দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায়; কিন্তু বাবা-মায়ের মুখে সন্তানের সাফল্যে যে নির্মল হাসি ফুটে ওঠে, সেই হাসি কোনো টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
আর সেই হাসিটাই আমি তখনও এনে দিতে পারিনি।
আমাদের বাড়িটা ছিল মাটির ঘর। আজকের দিনের মানুষের কাছে মাটির ঘর হয়তো শুধুই পুরোনো কোনো স্মৃতি, কিন্তু আমাদের কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে আপন ঠিকানা।
গরমের দিনে সেই মাটির ঘরটিই যেন আমাদের এসি হয়ে উঠত। বাইরে যখন রোদের তাপ মাটি পুড়িয়ে দিত, ঘরের ভেতরটা তখনও থাকত শীতল আর শান্ত। তখন আমাদের অজপাড়া গাঁয়ে বিদ্যুৎ ছিল না। তাই আজকের দিনের মতো ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা, বাতি কিংবা নানা যন্ত্রের ব্যবস্থা ছিল না।
গরম পড়লে গ্রামের মানুষজন গাছের ছায়ায় জড়ো হতো। সেখানে চলত গল্প, হাসি-ঠাট্টা, আড্ডা—কত না কথার আসর! কারও হাতে মোবাইল ছিল না, কারও চোখ আটকে থাকত না কোনো পর্দায়। মানুষের সঙ্গে মানুষেরই ছিল সবচেয়ে বড় যোগাযোগ। একটা গাছের ছায়াই তখন হয়ে উঠত আমাদের বৈঠকখানা।
সেই দিনগুলো এখন ভাবলে মনে হয়, অভাব ছিল অনেক কিছুতে, কিন্তু আনন্দের কোনো অভাব ছিল না।
ছোটবেলায় দাদা-দাদির আদরেও বড় হয়েছি। পরিবারের বড় নাতি হওয়ায় দাদা আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসতেন। তাঁর ভালোবাসার মধ্যে আমার জন্য আলাদা একটা জায়গা ছিল।
সন্ধ্যা নামলেই দাদা আমাকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে যেতেন। বাজারের আলো, মানুষের ভিড় আর দাদার হাত ধরে হাঁটার সেই মুহূর্তগুলো তখন হয়তো খুব সাধারণ মনে হতো। কিন্তু আজ বুঝি, শৈশবের সবচেয়ে দামি স্মৃতিগুলো আসলে এমন সাধারণ মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
বাজারে গেলে চকলেট-বিস্কুট খাওয়া হতো। দাদার সঙ্গে যাওয়া মানেই যেন আমার জন্য ছোট্ট একটা উৎসব।
তবে চকলেটের ব্যাপারে একটা মজার ঘটনা ছিল। আমি চকলেট খেতে খুব ভালোবাসতাম। আর সেই চকলেট খেতে খেতেই একসময় আমার দাদার সব পকেট যেন খালি করে ফেলেছিলাম!
এই কারণেই সবাই মজা করে আমাকে ‘ফোকলা’ বলে ডাকত। নামটা কে দিয়েছিল, ঠিক মনে নেই; কিন্তু ডাকনামটা কীভাবে যেন সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আজ এত বছর পরও ‘ফোকলা’ নামটা মনে পড়লে শৈশবের সেই দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, কোথাও একটা মাটির ঘর আছে, উঠানে বিকেলের আলো পড়ছে, আর দাদা হাত ধরে তাঁর বড় নাতিকে নিয়ে বাজারের পথে হাঁটছেন।
যখন আমাদের গ্রামে প্রথম বিদ্যুৎ এলো, তখন মনে হয়েছিল যেন আমাদের ছোট্ট পৃথিবীতেই নতুন কোনো যুগের সূচনা হয়েছে। সেই সময় আম্মা একটি সাদাকালো টেলিভিশন কিনে আনলেন। পুরো গ্রামের মধ্যে সম্ভবত আমাদের বাড়িতেই প্রথম টেলিভিশন এসেছিল। তাই সন্ধ্যা হলেই আমাদের বাড়িতে যেন ছোটখাটো এক আসর বসত।
সাদাকালো পর্দায় বিটিভির অনুষ্ঠান চলত। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম ‘আলিফ লায়লা’। তখনকার নাটক, সিনেমা কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠান আজকের মতো এত আধুনিক ছিল না; কিন্তু সেগুলোর মধ্যে ছিল এক ধরনের রুচিশীলতা, সরলতা আর পারিবারিক আবহ। টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা মানুষগুলোর চোখে তখন বিনোদনের পাশাপাশি ছিল এক ধরনের বিস্ময়।
সেই সময় টেলিভিশনে ছবি আসত এন্টেনার মাধ্যমে। কখনো ছবি ঝাপসা হয়ে গেলে কিংবা লাইন না পেলে এন্টেনা ঘোরানোর দায়িত্ব পড়ত আমাদের ওপর। একজন টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে বলত, ‘এখন এসেছে’, আরেকজন এন্টেনা ঘোরাত। সেই সামান্য কাজটাও তখন আমাদের কাছে ছিল বেশ আনন্দের।
আমার দাদার অনেক সম্পত্তি ছিল। কিন্তু মানুষের লোভ-লালসা ও নানা কারণে সেই সম্পত্তি ধীরে ধীরে হাতছাড়া হতে থাকে। দাদা পৃথিবীতে থাকাকালীন এসব নিয়ে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। তখন জীবনের কঠিন বাস্তবতা বোঝার মতো বয়স আমার ছিল না। শুধু দেখেছি, একসময় যাদের অনেক কিছু ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেক কিছুই হারিয়ে যায়।
দাদা-দাদিকেও খুব বেশি দিন পাইনি। আমি যখন তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি, তখনই তাঁদের হারিয়েছি। ছোটবেলায় মৃত্যুর অর্থ পুরোপুরি বোঝার মতো বয়স হয়নি। শুধু বুঝেছিলাম, যাঁরা প্রতিদিনের জীবনের অংশ ছিলেন, তাঁরা আর ফিরে আসবেন না।
আজ তাঁদের কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর কোথাও একটা শূন্যতা তৈরি হয়। বিশেষ করে দাদার হাত ধরে সন্ধ্যায় বাজারে যাওয়ার স্মৃতিগুলো মনে পড়লে মনে হয়, সময় যদি একবার পেছনে ফিরে যেত!
তখনকার দিনে স্মার্টফোন ছিল না। মানুষের হাতে মোবাইল ফোনও ছিল না নিত্যদিনের সঙ্গী হিসেবে। কারও হাতে সারাক্ষণ একটি ছোট্ট পর্দা জ্বলত না। মানুষের অবসর মানেই ছিল মানুষের সঙ্গে কথা বলা, উঠানে বসা, গল্প করা কিংবা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকা।
আজকের শিশুদের দিকে তাকালে সেই সময়ের সঙ্গে পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, কিন্তু সেই সহজতার সঙ্গে হারিয়ে গেছে অনেক কিছু।
আমার ছোটবেলার আরেকটি স্মৃতি হলো ‘ঠেকি’। তখন আমার দাদিকে ঠেকিতে ধান ভাঙতে দেখেছি। ধান থেকে চাল তৈরি করা কিংবা শস্য ভাঙার সেই পুরোনো পদ্ধতি ছিল আমাদের গ্রামীণ জীবনেরই একটি অংশ।
সেই দৃশ্যগুলো তখন খুব স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেগুলো এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। ঠেকির জায়গা নিয়েছে আধুনিক ধান ভাঙার মেশিন। কাজ সহজ হয়েছে, সময় বেঁচেছে; কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই পরিচিত শব্দ, সেই পরিশ্রম আর গ্রামীণ জীবনের একটা অংশ।
বিদ্যুৎ আসার আগের দিনগুলোতেও আমার শৈশবের অনেকটা কেটেছে হারিকেনের আলোয়। রাতে পড়তে বসলে সামনে থাকত ছোট্ট হারিকেন। তার হলুদাভ আলোয় বই খুলে বসতাম।
আজ হারিকেন এখনো কোথাও কোথাও দেখা যায়, কিন্তু তার প্রয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। তার জায়গা নিয়েছে বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক বাতি, পরে এসেছে আরও নানা আধুনিক ব্যবস্থা।
আমাদের অজপাড়া গাঁয়ে বিদ্যুৎ আসার পর যেন একে একে হারিয়ে যেতে শুরু করল শৈশবের পরিচিত কিছু জিনিস—হারিকেন, ঠেকি, সাদাকালো টেলিভিশন। সাদাকালো টেলিভিশনের জায়গা নিল রঙিন টিভি, ঠেকির জায়গা নিল আধুনিক মেশিন। জীবন সহজ হলো, পৃথিবী আধুনিক হলো; কিন্তু শৈশবের সেই পুরোনো দৃশ্যগুলো আর ফিরে এল না।
এখন এত রঙিন টেলিভিশন, এত প্রযুক্তি, এত সহজ যোগাযোগ—তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের সেই সাদাকালো দিনগুলোই যেন বেশি রঙিন ছিল।
শৈশবের সেই দিনগুলো এখনো মনে পড়ে। মনে পড়ে মাটির ঘর, হারিকেনের আলো, দাদার হাত ধরে বাজারে যাওয়া, সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে বসে ‘আলিফ লায়লা’ দেখা, গাছের ছায়ায় মানুষের গল্প আর পাঁচ টাকার ছোট্ট আনন্দ।
কিন্তু সময় কাউকে ধরে রাখে না। আধুনিকতা আর বয়সের ভারে আমিও হারিয়ে ফেলেছি আমার শৈশব।
আজকের দিনের শিশুরা মোবাইল ছাড়া যেন এক মুহূর্তও চলতে পারে না। তাদের শৈশবের অনেকটা সময় কেটে যায় ছোট্ট একটি পর্দার সামনে। অথচ আমাদের সময়ে বিনোদনের জন্য কোনো পর্দা দরকার হতো না। মাঠ ছিল, গাছ ছিল, বন্ধু ছিল, গল্প ছিল—আর ছিল অবাধ কল্পনার এক বিশাল পৃথিবী।
আমার সমবয়সীদের অনেকের শৈশবও হয়তো আমার মতোই কেটেছে। আমাদের আনন্দগুলো ছিল সহজ, কিন্তু সেই সহজ আনন্দের গভীরতা ছিল অনেক বেশি।
এরপর একদিন ক্লাস সিক্সে উঠলাম।
হঠাৎ নিজের ভেতরেই কেমন একটা পরিবর্তন অনুভব হলো। মনে হলো—আমি কি সত্যিই বড় হয়ে গেছি?
হয়তো হ্যাঁ। শৈশবের শেষ সীমানা পেরিয়ে আমি ধীরে ধীরে কৈশোরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
ক্লাস সেভেনে উঠতে উঠতেই পৃথিবীর চেহারা বদলে গেল। দেশে এলো করোনাভাইরাস। একে একে বন্ধ হয়ে গেল স্কুল-কলেজ। থেমে গেল মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা। যে গ্রাম আর বাজার সবসময় মানুষের কোলাহলে মুখর থাকত, সেগুলো হঠাৎ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মনে হতো, চেনা পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তে অচেনা হয়ে গেছে।
শহরের চিরচেনা যানজট কোথায় যেন হারিয়ে গেল। রাস্তাঘাট ফাঁকা। মানুষ ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি। খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়াও যেন নিষিদ্ধ।
আমার স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল।
অদ্ভুতভাবে, সেই বন্দিজীবনের মধ্যেই মনে হলো—আমি যেন আবার আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের এক টুকরো ফিরে পেয়েছি। স্কুল নেই, ক্লাস নেই, ছুটে চলার তাড়া নেই। চারপাশে শুধু বাড়ি আর পরিচিত মানুষ।
তবে পড়াশোনা পুরোপুরি বন্ধ থাকল না। আব্বা বাড়িতে একজন শিক্ষক ঠিক করে দিলেন। আবার শুরু হলো পড়াশোনা। স্কুলে যাওয়া হতো না, কিন্তু বই-খাতা নিয়ে পড়তে বসতে হতো।
স্কুল বন্ধ থাকতে থাকতে তার দরজায় ধুলো জমল, তালায় মরচে ধরল। সময়ও থেমে থাকল না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে হতে আমি ক্লাস নাইনে উঠে গেলাম।
এবার নিজেকে আরও বড় মনে হলো।
কিন্তু শৈশবের মতো সেই দিনগুলোও আর ফিরে এল না।
ক্লাস নাইনে ওঠার পর ভালো ফল করায় বাবা-মা আমাকে শহরে পাঠিয়ে দিলেন। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো—গ্রাম থেকে শহরে।
শৈশবটা শেষ হতে না হতেই যেন আমাকে শহরের জীবনে পা রাখতে হলো।
গ্রামের খোলা আকাশ, মাটির রাস্তা, মায়ের আঁচল, বাবার কঠিন শাসন—সবকিছু থেকে দূরে চলে এলাম। শহরে এসে বুঝলাম, বড় হওয়া মানে শুধু বয়স বাড়া নয়; বড় হওয়া মানে অনেক পরিচিত জিনিসকে পেছনে ফেলে আসা।
শহরে যে আশা নিয়ে এসেছিলাম, তা পূরণ করতে পারিনি। আমার নিজের ফাঁকিবাজিই তার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল।
অনেক কেঁদেছি। নিজের ভুল বুঝেছি। নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। মনে হয়েছে, এবার সত্যিই বদলাব।
কিন্তু মানুষ নিজের কিছু অভ্যাসের কাছে কতটা দুর্বল, সেটা তখনই বুঝলাম।
একই ভুল আমি বারবার করেছি।
আর প্রতিবার ভুল করার পর মনে হয়েছে—ইশ! যদি সময়টা আরেকবার ফিরে পেতাম, তাহলে হয়তো এবার ঠিকভাবে পথটা বেছে নিতাম।
লেখক:মোতাহার

