নায়ক হিসেবে সালমান শাহর পরিচিতি যতটা বিস্তৃত, সংগীতের সঙ্গে তার সম্পর্কটাও ছিল ততটাই গভীর। অভিনয়ের আলোয় আসার বহু আগেই গান ছিল তার প্রিয় এক মাধ্যম। কৈশোরে বন্ধুমহলে গান গেয়ে পরিচিতি পাওয়া সেই তরুণ পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের ব্যস্ত তারকা হয়ে ওঠেন। সময়ের অভাবে নিয়মিত সংগীতচর্চা করতে না পারলেও সুযোগ পেলেই গিটার হাতে কিংবা গুনগুন করে নিজের ভালো লাগার গান তুলে ধরতেন তিনি। এমনকি শেষ পর্যন্ত নিজের কণ্ঠে প্লেব্যাকও করেছিলেন জনপ্রিয় এই অভিনেতা।সালমান শাহর সংগীতচর্চার শুরুটা ছোটবেলাতেই। স্কুলে পড়ার সময় গান গাওয়ার কারণে বন্ধুদের কাছেও আলাদা পরিচিতি ছিল তার। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান ‘ছোট্ট খবর’-এ গান গাওয়ার সুযোগ পান। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে টেলিভিশনের পর্দায় তার উপস্থিতি বাড়তে থাকে।অভিনয়ের জগতে সালমানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৫ সালে বিটিভির নাটক ‘আকাশ ছোঁয়া’ দিয়ে। একই সময়ে ‘দেয়াল’, ‘সব পাখি ঘরে ফিরে’র মতো নাটকেও অভিনয় করেন তিনি। পরে ‘সৈকতে সারস’সহ আরও কয়েকটি নাটকে দেখা যায় তাকে। ছোট পর্দার পরিচিত মুখ থেকে একসময় বড় পর্দার নায়ক হয়ে ওঠেন সালমান।
১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর তার ক্যারিয়ার নতুন গতি পায়। এরপর একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে অল্প সময়েই দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। চলচ্চিত্রের ব্যস্ততা যত বেড়েছে, সংগীতচর্চার সুযোগ তত কমেছে। কিন্তু গান থেকে দূরে সরে যাননি তিনি।তার অভিনীত ১৯৯৪ সালের ধারাবাহিক নাটক ‘ইতিকথা’য় সংগীতের প্রতি সালমানের সেই ভালোবাসার প্রকাশ দেখা যায়। নাটকে তিনি অভিনয় করেছিলেন একজন সংগীতশিল্পীর চরিত্রে। গিটার হাতে গান গাওয়ার দৃশ্যেও দেখা যায় তাকে। ‘বজ্রযোগিনী’ শিরোনামের সেই গানে উঠে এসেছিল বব মার্লে ও পল রবসনের প্রসঙ্গ। এমনকি নাটকের সংলাপে পল রবসনকে নিজের গুরুও বলেছিলেন সালমানের চরিত্রটি। একই নাটকের অন্য একটি দৃশ্যে তার কণ্ঠে শোনা যায় ‘মা’কে ঘিরে একটি ইংরেজি গান।তবে পর্দার চরিত্রে গান গাওয়ার মধ্যেই তার সংগীতযাত্রা সীমাবদ্ধ থাকেনি। চলচ্চিত্রের সেটেও সুযোগ পেলেই গান করতেন সালমান। ‘প্রেম যুদ্ধ’ সিনেমার শুটিং চলাকালে একদিন সেটে নিজের মনে গান গাইছিলেন তিনি। বিষয়টি নজরে পড়ে নির্মাতা জীবন রহমানের। সালমানের কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হয়ে তিনি প্রশংসা করেন। আর তখনই মজার ছলে সালমান বলে বসেন, তার সিনেমায় প্লেব্যাক করানো যায় কি না।
সালমানের সেই রসিক প্রস্তাবকেই বাস্তব করার সিদ্ধান্ত নেন জীবন রহমান। জনপ্রিয় নায়ককে দিয়ে গান গাওয়ানোর সম্ভাবনা তখন নির্মাতাদের কাছেও ছিল নতুন ধরনের এক আকর্ষণ। সেই পরিকল্পনা থেকেই গীতিকার ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নির্মাতা।
এরপর তৈরি হয় সালমান শাহর কণ্ঠে ‘তুমি আমার জীবনের এক স্বপ্ন যেন।’ গানে তার সহশিল্পী ছিলেন কনকচাঁপা। রেকর্ডিংয়ের সময়ও নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন সালমান। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই গানটির রেকর্ডিং শেষ করেছিলেন তিনি। গানের কথা ছিল মৌলিক; তবে সুরের কাঠামো নেওয়া হয়েছিল কুমার শানুর গাওয়া ‘এক লাড়কি কো দেখা তো’ গান থেকে।
পর্দার জনপ্রিয় নায়কের কণ্ঠে গানটি দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বেশ সাড়া ফেলে। ফলে জীবন রহমানও পরবর্তী সিনেমায় সালমানকে দিয়ে আরও একটি গান করানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য সে সুযোগ দেয়নি। ১৯৯৬ সালে সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যুর পর সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। তার কণ্ঠে আরও একটি গান ‘রজনীগন্ধা’ ইউটিউবে পাওয়া যায়। গানটির বিবরণ অনুযায়ী, এটি একটি নির্মাণাধীন সিনেমার জন্য রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
অভিনয়, ফ্যাশন কিংবা পর্দার উপস্থিতি—সালমান শাহকে নিয়ে আলোচনার জায়গা অনেক। এর সঙ্গে যদি সংগীতের অধ্যায়টিও যুক্ত করা হয়, তাহলে তার বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি দিক সামনে আসে। নায়ক হিসেবে তার উত্থান ছিল বিস্ময়কর, আর গানের প্রতি ভালোবাসা ছিল অনেকটাই ব্যক্তিগত। সেই ভালোবাসা থেকেই একসময় কণ্ঠ দিয়েছিলেন প্লেব্যাকে। সময় তাকে থামিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু গানের সেই ছোট্ট অধ্যায়টুকুও আজ তার স্মৃতিরই অংশ হয়ে আছে।

