‘নানকিং চুক্তি’ আধুনিক পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী কিন্তু বেদনাদায়ক অধ্যায়। এটি স্বাক্ষরিত হয় ১৮৪২ সালের ২৯ আগস্ট। যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি স্যার হেনরি পটিঙ্গার এবং চীনের কিং রাজবংশের প্রতিনিধি কাইচিং ও ইলিফু রাজকীয় যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস কর্নওয়ালিস’-এ বসে এ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই ঐতিহাসিক সমঝোতার মধ্য দিয়েই যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যে চলা প্রথম আফিম যুদ্ধের (১৮৩৯–১৮৪২) প্রথাগত সমাপ্তি ঘটে।১৮ শতকের শেষভাগে ব্রিটেন ও চীনের বাণিজ্য ভারসাম্য ব্রিটেনের বিপক্ষে ছিল। চীনের চা, রেশম ও পোর্সেলিনের বিনিময়ে রূপা সরবরাহ করতে করতে ব্রিটিশ রাজকোষ খালি হয়ে ওঠে। এই ঘাটতি পূরণে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে উৎপাদিত আফিম বেআইনিভাবে চীনে পাচার শুরু করে। চীনে আফিমের ভয়াবহ বিস্তার ঘটে। কোটি কোটি মানুষ এতে আসক্ত হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ও সামাজিক বিপর্যয় রুখতে চীনের কিং সম্রাট দাওগুয়াং আফিম বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কমিশনার লিন সেক্সুকে দেওয়া হয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ। লিন সেক্সু ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ আফিম বাজেয়াপ্ত করে ধ্বংস করেন। এই ঘটনাকে অজুহাত করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।প্রযুক্তিগত ও সামরিক দিক থেকে এগিয়ে থাকা ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে চীন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ফলে চীনকে একটি অত্যন্ত অপমানজনক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। নানকিং চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর একটি ছিল চীনকে হংকং দ্বীপটি চিরতরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে হস্তান্তর করা (যা ১৯৯৭ সালে চীন ফিরে পায়)। এরপর ক্যান্টন (গুয়াংজু), আময় (ঝিয়ামেন), ফুচৌ, নিংবো এবং সাংহাই—এই পাঁচটি প্রধান বন্দর উন্মুক্ত করা হয় এবং সেখানে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের বসবাস ও মুক্ত বাণিজ্যের অধিকার দেওয়া হয়। এ ছাড়া চীনকে যুদ্ধের ব্যয় এবং ধ্বংসকৃত আফিমের মূল্য বাবদ মোট ২১ মিলিয়ন সিলভার ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্রিটেনকে দিতে বাধ্য করা হয়। অবসান ঘটানো হয় চীনা বণিক সংগঠন ‘কোহং’-এর একচেটিয়া বাণিজ্য ক্ষমতার।
নানকিং চুক্তিকে চীনের ইতিহাসে প্রথম ‘অসম চুক্তি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে চীনের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব হয়। এটি চীনের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা করে। এই ঘটনা পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মতো অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিকেও চীনে নিজস্ব সুবিধা আদায়ে উৎসাহিত করেছিল। চীনা জাতীয়তাবাদে এ ঘটনাকে ‘অপমানের শতবর্ষ’-এর সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা আধুনিক চীনের রাজনৈতিক চিন্তাধারা গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

