etcnews
ঢাকাWednesday , 22 April 2026
  1. অনিয়ম
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ইসলাম
  5. উন্নয়ন
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলা
  8. জাতীয়
  9. নির্বাচন
  10. প্রতিবাদ
  11. প্রযুক্তি
  12. বানিজ্য
  13. বিনোদন
  14. বিশ্ব
  15. রাজনীতি
box ad 6
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘ডিজিটাল জম্বি’: যেভাবে আমরা অ্যালগরিদমের কাছে বন্দী

etcnews
April 22, 2026 5:20 pm
Link Copied!

জম্বি ছত্রাক বা ওফিওকর্ডিসেপস-এর জীবনচক্র বড় অদ্ভুত, রহস্যময় আর নৃশংস। এই ছত্রাক যখন কোনো পিঁপড়াকে আক্রমণ করে, তখন সে পিঁপড়াটির স্নায়ুতন্ত্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ছত্রাকের হুকুমে বিমোহিত হয়ে পিঁপড়াটি নিজের চিরচেনা বাসা ছেড়ে উঠে যায় কোনো উঁচু গাছের পাতায়, যেখানে ছত্রাকের বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত হয়। পিঁপড়াটি পাতা কামড়ে পড়ে থাকে। পিঁপড়ার পুরো সত্তাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে শরীর ধীরে ধীরে কুরে কুরে খায় এই ছত্রাক। একটা পর্যায়ে পিঁপড়ার মগজ ফুঁড়ে বীভৎসভাবে বেরিয়ে আসে ছত্রাকের নতুন বংশধর।

জম্বি ছত্রাক সংক্রমণের পর পিঁপড়াটি কোনো স্বাধীন প্রাণী থাকে না, সে কেবল ওই ছত্রাকের লক্ষ্য পূরণের এক জড় মাধ্যম বা জম্বি।

আজকের এই দুনিয়ায় পিঁপড়ার মতো আক্ষরিক অর্থে জম্বিতে আক্রান্ত বেশির ভাগ মানুষ। ছত্রাকটির নাম সোশ্যাল মিডিয়া। প্রয়োজন মেটানোর ছদ্মবেশে মানুষের হাতে এসেছে স্মার্টফোন। আর স্মার্টফোনের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে মানুষের মগজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে এই ডিজিটাল জম্বি।

আমরা এখন আর নিজের ইচ্ছায় ঘাড় ফেরাই না, বরং স্ক্রিনের নীল আলো আমাদের যেভাবে নাচায়, আমরা সেভাবেই নাচি। এই নব্য জম্বিদশা আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অন্তহীন স্ক্রলিংয়ের গহ্বরে, যেখানে আমাদের অস্তিত্ব বলতে শুধু একজন ‘বিজ্ঞাপনের ভোক্তা’ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। বাড়িয়ে দিয়েছে একাকিত্ব ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি। কমিয়ে দিয়েছে মেধা ও আয়ু।

জেন–জির আইকিউ কি কমছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউিএইচও) সম্প্রতি একাকিত্বকে একটি জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করেছে। একাকিত্ব প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত। শুধু তা–ই নয়, বিংশ শতাব্দীজুড়ে দেখা গিয়েছিল, প্রতি দশকে মানুষের গড় আইকিউ প্রায় ৩ পয়েন্ট করে বাড়ছে, যা ‘ফ্লিন ইফেক্ট’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।

বর্তমান জেনারেশন; অর্থাৎ ‘জেন–জি’-এর ক্ষেত্রে বুদ্ধি বাড়া তো দূরের কথা, বরং মেধার সূচক নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট’। অর্থাৎ এই ডিজিটাল জম্বি আমাদের শরীর ও মগজ দুটোই কুরে কুরে খেতে খেতে টি এস এলিয়টের কবিতার সেই ‘ফাঁপা মানুষ’ বা ‘হলোমেন’-এ পরিণত করছে।

এই জিম্মিদশা হঠাৎ নয়। সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি দানবগুলো মানুষের মগজের নিয়ন্ত্রণ নিতে শত শত কোটি ডলার খরচ করে গবেষণা চালাচ্ছে। বিপুল পয়সা ঢেলে ল্যাবে নামীদামি মনস্তত্ত্ববিদদের দিয়ে গবেষণা করছে আপনার আমার মনস্তত্ত্বকে। ফেসবুক, লিংকডইনসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লোগোতে নীলের বিভিন্ন শেড ব্যবহারের কারণ: এই রং মানুষের মনে একধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা আর নির্ভরতার আবেশ তৈরি করে, যাতে আপনি দীর্ঘক্ষণ সেখানে সময় কাটাতে দ্বিধা না করেন।

সন্তানদের আইপ্যাড বা স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখা

নোটিফিকেশনের ডটটির রং টকটকে লাল। লাল হলো বিপদের সংকেত, যা মানুষের আদিম মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে বাধ্য করে। এই লাল বিন্দুটি দেখার পর আমাদের মগজে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়—যতক্ষণ না আমরা ওটা খুলছি, আমাদের শান্তি নেই। আপনি স্ক্রল করছেন, একটার পর একটা ভিডিও দেখছেন। কিন্তু ভাবার কোনো সময় পাচ্ছেন না।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিহাস হলো, এই ডিজিটাল জম্বি যাঁরা তৈরি করছেন, সেই প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের মালিকেরা কিন্তু তাঁদের নিজেদের সন্তানদের আইপ্যাড বা স্মার্টফোন থেকে শত হাত দূরে রাখছেন।

দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ কিংবা রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টিশীলতার গভীরে তাকালে আমরা এই ‘ফ্লো’ বা নিমগ্নতারই দেখা পাই। এটি সেই প্রকৃত আনন্দ, যা ডিজিটাল আসক্তির সস্তা ডোপামিন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানের এই বিক্ষিপ্ত সময়ে চিকসেন্টমিহালির এই দর্শন আমাদের শেখায় কীভাবে গভীর মনোযোগের মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করা সম্ভব।

ঠিক একইভাবে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি–সম্রাটেরা তাঁদের সন্তানদের পাঠাচ্ছেন এমন সব ব্যয়বহুল স্কুলে, যেখানে কোনো ল্যাপটপ বা ট্যাবে পড়ালেখা হয় না, বরং চক-ডাস্টার আর কাগজের বই-ই প্রধান মাধ্যম। তাঁরা জানেন, প্রযুক্তি তাঁদের সন্তানদের সৃজনশীলতা আর গভীর মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বা ‘ফ্লো’ নষ্ট করে দেবে। তাঁরা তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে বুদ্ধিমত্তার শিখরে রাখতে চান, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের মগজকে আরও সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

অর্থাৎ পৃথিবীটা ভাগ হয়ে যাচ্ছে দুই ভাগে—সামান্য কয়েকজন বুদ্ধিমান মানুষের একটি দল হবে মগজের নিয়ন্ত্রক, আর বাকি বৃহত্তর অংশ হবে স্রেফ ‘ডিজিটাল জম্বি’।

মানষু কেন ফোন স্ক্রল করতেই থাকে বা রিল দেখা কেন শেষ হয় না

আপনি হয়তো ভাবলেন, একটা রান্নার রেসিপি দেখে ফোনটা রাখবেন, অমনি স্ক্রিনে ভেসে এল এক হৃষ্টপুষ্ট পান্ডা পরম নিশ্চিন্তে বাঁশ চিবোচ্ছে। পান্ডা দেখা শেষ হতে না হতেই আবির্ভূত হলেন এক মোটিভেশনাল স্পিকার, যিনি চিৎকার করে বলছেন—‘ঘুম থেকে উঠুন, পৃথিবী জয় করুন!’ অথচ আপনি তখনো বিছানায় আধশোয়া হয়ে ঘাড় ত্যাড়া করে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল ঘষছেন।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয় স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের সেই ‘দ্য রাইম অব দ্য অ্যানশিয়েন্ট ম্যারিনার’-এর হাহাকারের সঙ্গে: ‘ওয়াটার, ওয়াটার, এভরিওয়্যার, নর অ্যানি ড্রপ টু ড্রিংক’।

একইভাবে তথ্য আর বিনোদনের লোনা সাগরে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু নেই আত্মার তৃষ্ণা মেটানোর মতো একফোঁটা শুদ্ধ জ্ঞান। আসলে আমরা এখন এক অদ্ভুত ‘আঙুলের ব্যায়ামে’ অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফরাসি দার্শনিক রনে দেকার্ত বলেছিলেন, ‘আই থিঙ্ক, দেয়ারফোর আই অ্যাম’ (আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি)। বর্তমানে বোধ হয় বলতে হবে, ‘আই স্ক্রল, দেয়ারফোর আই অ্যাম ’ (আমি স্ক্রল করি, তাই আমি আছি)।

চিন্তা করার ফুরসত কই? এক রিল থেকে অন্য রিলে যাওয়ার মাঝে যে কয়েক মিলিসেকেন্ডের বিরতি, ততটুকু সময়ই এখন আমাদের চিন্তার ব্যাপ্তি।

এআই যেভাবে মানুষকে ব্যবহার করছে

প্লেটোর ‘গুহাচিত্র’ বা ‘অ্যালেগরি অব দ্য কেভ’-এর কথা ভাবুন। গুহার ভেতরের বন্দীরা যেমন দেয়ালের ছায়া দেখে সেটাকেই বাস্তব ভেবে ভুল করত, আমরাও এই অ্যালগরিদমের তৈরি করা রঙিন ছায়া দেখে জীবনকে বিচার করছি। আপনি কী দেখবেন, কী ভাববেন, এমনকি কী কিনতে চাইবেন, তা ঠিক করে দিচ্ছে কয়েক হাজার মাইল দূরের কোনো সার্ভারে বসে থাকা গাণিতিক কোড। আপনি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করছেন বলে ভাবছেন ঠিকই, কিন্তু নিভৃতে সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই আপনাকে ব্যবহার করছে, তার ডেটা সংগ্রহের আকর হিসেবে।

‘নিজেকে জানো’—সক্রেটিসের এই উপদেশ কাম পরামর্শ এখন কেবলই পরিহাস; কারণ, আমরা নিজেদের যতটা না চিনি, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম আমাদের বেশি চেনে।

এই জম্বিদশা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী মিহালি চিকসেন্টমিহালির ‘ফ্লো’ বা গভীর নিমগ্নতা তত্ত্ব। হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত এই আমেরিকান গবেষক তাঁর ‘অ্যাপ্লিকেশন অব ফ্লো ইন হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সুখ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়; বরং এটি একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা। তাঁর মতে, মানুষের দক্ষতা এবং কাজের চ্যালেঞ্জের মধ্যে যখন একটি চমৎকার ভারসাম্য তৈরি হয়, তখনই জন্ম নেয় ‘ফ্লো’। এই অবস্থায় মানুষ তার কাজের ভেতর এতটাই ডুবে যায় যে সময়ের জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলে।

মানুষের কল্পনাশক্তি কেন কমে যাচ্ছে

দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ কিংবা রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টিশীলতার গভীরে তাকালে আমরা এই ‘ফ্লো’ বা নিমগ্নতারই দেখা পাই। এটি সেই প্রকৃত আনন্দ, যা ডিজিটাল আসক্তির সস্তা ডোপামিন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানের এই বিক্ষিপ্ত সময়ে চিকসেন্টমিহালির এই দর্শন আমাদের শেখায় কীভাবে গভীর মনোযোগের মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করা সম্ভব।

কিন্তু দুঃখজনক হলো, আজকের এই ডিজিটাল জম্বি মহামারি আমাদের সেই নিমগ্ন হওয়ার জন্মগত ক্ষমতাটিই কেড়ে নিয়েছে।

টেলিভিশন আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষের মনোযোগের এই ক্ষয় শুরু হয়েছিল। তখন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যম সমালোচক ও চিন্তাবিদ আর্নেস্ট পালসফোর্ড বলেছিলেন—টিভি এমন এক যন্ত্র, যা আমাদের কথা বলা বা চিন্তা করার সুযোগ দেয় না, কেবল তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে। এটি মানুষের কল্পনাশক্তিকে হত্যা করে।

ভিডিও দেখার চেয়ে বই পড়া কেন হাজার গুণ বেশি কার্যকর, তা বোঝা জরুরি। আপনি যখন কোনো ভিডিও দেখেন, তখন আপনি অন্যের কল্পনাশক্তিকে গিলছেন। পর্দার দৃশ্য, রং, আর শব্দ আপনাকে বলে দিচ্ছে কী ভাবতে হবে। সেখানে আপনার নিজস্ব চিন্তার কোনো জায়গা নেই। ভিডিও আপনার ওপর অন্যের কল্পনা চাপিয়ে দেয়।

আর্জেন্টিনার লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস মনে করতেন, বই হলো মানুষের মগজের সম্প্রসারণ। আপনি যখন একটি বই পড়েন, তখন প্রতিটি বাক্য আপনার মস্তিষ্কে একটি নিজস্ব ছবি তৈরি করে—বই পড়ার সময় আমাদের মস্তিষ্ক যে নিজস্ব জগৎ তৈরি করে, এটাই মানুষের প্রকৃত সৃজনশীলতা। ভিডিও আমাদের কল্পনাশক্তিকে অন্যের অধীনে নিয়ে যায়, আর বই আমাদের চিন্তাকে মুক্ত করে। বইয়ের পাতা ওলটানোর সময় আপনার মস্তিষ্ক যে সক্রিয়তায় থাকে, ভিডিও দেখার সময় তা থাকে না বললেই চলে। বই পড়া হলো মগজের ব্যায়াম, আর ভিডিও দেখা হলো মগজকে স্থবির করে রাখা।

মানুষের আয়ু কেন ছোট হয়ে আসছে

মনোযোগ কোনো অফুরন্ত সম্পদ নয়। এটি সীমিত। এই সম্পদ যখন আমরা ছোট ছোট ভিডিও বা অর্থহীন পোস্টের পেছনে খরচ করি, তখন আমরা আসলে আমাদের জীবনের আয়ুই ছোট করে ফেলছি। সৃজনশীলতা বা কোনো মহান কাজ করার জন্য যে দীর্ঘ সময়ের গভীর অভিনিবেশ প্রয়োজন, তা এই ডিজিটাল জম্বি মহামারির মধ্যে অসম্ভব।

প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার কাছে নিজের মগজকে জিম্মি রাখা মানে নিজের মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দেওয়া। জীবনের সার্থকতা ওই লাল নোটিফিকেশনে নেই, আছে কোনো একটি মহৎ কাজে নিজেকে হারিয়ে ফেলার আনন্দময় ‘ফ্লো’-এর মধ্যে। এই সত্যটি যত দ্রুত আমরা বুঝব, ততই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও স্বাধীন পৃথিবী নিশ্চিত করতে পারব। নতুবা, জম্বি ছত্রাক যেমন পিঁপড়াকে কেবল তার বংশবৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, প্রযুক্তিও আমাদের কেবল তার মুনাফার মাধ্যম হিসেবেই বাঁচিয়ে রাখবে—মানুষ হিসেবে নয়।

প্রযুক্তি আমাদের ‘কানেক্টেড’ বা যুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু বিনিময়ে সে আমাদের উপহার দিয়েছে এক গভীর বিচ্ছিন্নতা। আজ আমরা জনসমুদ্রে থেকেও একা। জাপানি শব্দ ‘কোদোকুশি’ বা একা মৃত্যুর যে বিভীষিকা আমরা আধুনিক সভ্যতায় দেখছি, তা আসলে এই বিচ্ছিন্নতারই চূড়ান্ত রূপ।

শুধু জাপান নয়, ডিজিটাল জম্বির কারণে কোদোকুশি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। যে মানুষটি সারা জীবন কয়েক হাজার ‘ভার্চ্যুয়াল ফ্রেন্ড’ নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকল, শেষবিদায়ের বেলায় তার শিয়রে জল দেওয়ার মতো একজন রক্ত-মাংসের মানুষও নেই—এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?

আমরা হয়তো অজান্তেই শরৎচন্দ্রের সেই অমোঘ পরিণতির দিকে দ্রুতপায়ে হেঁটে যাচ্ছি। দেবদাস উপন্যাসের সেই শেষ হাহাকার—‘ওই হতভাগ্যের মতো আর যেন কারও মৃত্যু না ঘটে; মরণেও যেন একের করুণায় আর একজনের চোখের জল পড়ে’—আজকের এই ডিজিটাল যুগে এসে এক নতুন ও ভয়াবহ অর্থ বহন করছে। দেবদাসের মৃত্যু ছিল পেয়ে হারানো প্রেম বিরহের, কিন্তু আজকের এই কোদোকুশি বা নিঃসঙ্গ মৃত্যু হলো চরম ঔদাসীন্যের। আমাদের চোখের জল এখন আর গাল বেয়ে পড়ে না, তা কেবল ইমোজির ক্ষণস্থায়ী নীল রঙে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

যদি আমরা এখনই এই জম্বি ছত্রাকের মায়াজাল ছিন্ন করে ‘ফ্লো’ বা প্রকৃত নিমগ্নতায় ফিরে না আসি, তবে আমাদের পরিণতিও হবে সেই হতভাগ্যের মতো। আমরা হয়তো বেঁচে থাকব, কিন্তু আমাদের প্রাণ থাকবে না; আমাদের চারপাশে ভিড় থাকবে, কিন্তু কোনো মায়া থাকবে না। যন্ত্রের এই দাসে পরিণত হওয়ার চেয়ে বড় পরাজয় আর নেই।

এই সাইটে কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।