এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনার পর স্পেনের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে গেছে বলে স্বীকার করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। বুধবারের (২৮ অক্টোবর) ট্রেন সংঘর্ষে অন্তত ৬৯ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর দেশটির রেল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।শুক্রবার সানচেজ বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দিতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। হতাহতদের মধ্যে অন্তত ২৩ দেশের নাগরিক রয়েছেন। এ বছরের দ্বিতীয় প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।বুধবার সকাল ৯টার কিছু আগে রাজধানী মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়ার দিকে যাচ্ছিল দুটি ট্রেন। এর একটি রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের এবং অন্যটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইরিওর। মধ্যাঞ্চলীয় কাস্তিয়া-লা মানচা অঞ্চলের উর্দার কাছে দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রথমে ইরিওর ট্রেনটি থেমে গেলে পেছন থেকে রেনফেরের ট্রেনটি তাতে ধাক্কা দেয়। এতে কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়।
এর মাত্র নয় মাস আগে আন্দালুসিয়ার আদামুজ শহরের কাছে একই রেলপথে রেনফে ও ইরিওর দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছিলেন।সানচেজ বলেন, এত উন্নত দ্রুতগতির রেলব্যবস্থা থাকা একটি দেশের জন্য এক বছরের মধ্যে এ ধরনের দুটি বড় দুর্ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করাই সরকারের দায়িত্ব নয়, দেশের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করতে কার্যকর সমাধানও দিতে হবে।
তিনি বলেন, দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে গেছে। এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে কারণ নির্ণয়ের পাশাপাশি সমাধানও দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে সংবাদ সম্মেলন করেন। পদত্যাগের ক্রমবর্ধমান দাবির মুখেও দায়িত্ব ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। পুয়েন্তে বলেন, আপাতত তার কাজ পদে থাকা নিয়ে আলোচনা নয়, বরং সমস্যার সমাধান, দুর্ঘটনার কারণ স্পষ্ট করা এবং জনগণকে ব্যাখ্যা দেওয়া।
তিনি বলেন, তদন্তে ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যর্থতা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তির দায় প্রমাণিত হলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুয়েন্তে আবারও ইঙ্গিত দিয়েছেন, বুধবারের দুর্ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফের মাদ্রিদ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের ভূমিকা থাকতে পারে।
তার তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার আগে এলজেডবি সংকেতব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কাজ হলো সামনে রেলপথে অন্য ট্রেন থাকলে চলন্ত ট্রেন থামিয়ে দেওয়া। তবে এ ধরনের বিভ্রাট অস্বাভাবিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মানুষের ওপর বর্তায়, যা পরিবহন খাতের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ঘটে।
পরিবহনমন্ত্রী আরও বলেন, আদিফের একজন নিয়ন্ত্রণকর্মী রেনফের ট্রেনটিকে স্বাভাবিক গতিতে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, সামনে কোনো বিপদ আছে কি না তা চালকের আগেভাগে শনাক্ত করার সুযোগ দিতে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশ দেওয়ার কথা ছিল।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরিওর ট্রেনটিকে ধাক্কা দেওয়ার সময় রেনফের ট্রেনটির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ২০০ কিলোমিটার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি, নির্দেশনা ও পদক্ষেপের ফলে শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ ঘটে। এ সময় দুর্ঘটনা ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যকর ছিল না।
পুয়েন্তে জানান, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকর্মীর বয়স ৪৮ বছর। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ হালনাগাদ ছিল এবং নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল দুই বছর। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি ওই নির্দিষ্ট এলাকার দায়িত্বে ছিলেন। ফলে এলাকাটি তার পরিচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
তবে সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন রেল শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। তাদের অভিযোগ, কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ রয়েছে, যা নিরাপদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে। এ কারণে আরও জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রেল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রকদের সংগঠন এসসিএফের মুখপাত্র রাকেল আয়োন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ক্রমশ খারাপ কর্মপরিবেশে দায়িত্ব পালন করা একজন সাধারণ কর্মীর ওপর মন্ত্রী দায় চাপাচ্ছেন। মানুষের ভুল হতে পারে; কিন্তু নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়মিত অকার্যকর হয়ে পড়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া কঠিন।
এদিকে স্পেনের রক্ষণশীল পিপলস পার্টি (পিপি) পরিবহনমন্ত্রী পুয়েন্তের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছে। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় আগাম নির্বাচনে সানচেজের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক সংখ্যালঘু সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলটির দাবি।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

