দেশের শেয়ারবাজারের ভালোমন্দ না বুঝে ও চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই অন্যের নির্দেশমতো বিনিয়োগ করার রীতি বহু পুরোনো। অথচ এই বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বুঝে-শুনে বিনিয়োগের পরামর্শ দেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এখানে জেনে-বুঝে ভালো শেয়ারে বিনিয়োগের বিকল্প নেই।কিন্তু, বাস্তবতা হলো- ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করতেই যত অনীহা। ভালো শেয়ারে বিনিয়োগে দ্রুত বড় ‘ক্যাপিটাল গেইন’ পাওয়ার সম্ভাবনা যেমন কম থাকে, ঝুঁকিও থাকে খুবই সামান্য। বিপরীতে দুর্বল শেয়ারে উচ্চ ঝুঁকির পাশাপাশি বড় ‘ক্যাপিটাল গেইন’ হওয়ার প্রলোভন থাকে বেশি। তাই না জেনে-বুঝে উচ্চ ঝুঁকির মুখে বড়ো মুনাফা লুফে নিতেই বেশি আগ্রহ দেখান ‘অবুঝ বিনিয়োগকারী’। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্র রাতারাতি কোটিপতি বনে যান, আর ঝুঁকির মুখে সর্বস্বান্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারী।
গুজব, কারসাজি কিংবা অসাধু চক্রের তৎপরতা- বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘ বছর ধরেই এই বাজারে অসাধু চক্রের তৎপরতায় ভালো শেয়ারের পরিবর্তে দুর্বল শেয়ারেই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিপরীতে মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভালো শেয়ার বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সময়ে সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে কারসাজি বন্ধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল মিলছে খুবই সামান্য। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অসাধু চক্র শনাক্তে যতটা সময় নেয়, ততক্ষণে সাধারণ বিনিয়োগকারী তাদের ফাঁদে নিঃস্ব হয়ে যায়।গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের পর দেশের শেয়ারবাজারে ‘একটি চক্র’ সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই চক্রটি বিগত সরকারের সময়ে যেভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্য করে উৎপাদন বন্ধ থাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, এখনো ঠিক একই পদ্ধতিতে এগিয়ে চলছে। এতে ওই চক্রের লোভনীয় প্রস্তাবে বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে আবারো ফেঁসে যাচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। গুজব ছড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে যেই দামে শেয়ারগুলো তুলে দেওয়া হচ্ছে, তাতে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করা অর্থের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে।এ বিষয়ে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাজারে বর্তমানে ভালোমানের শেয়ারের অভাব রয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে বহুজাতিক ও দেশীয় ভালো কোম্পানিগুলোকে আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। আর বাজারে যেসব ভালো শেয়ার আছে, সেগুলোও এখন অতিমূল্যায়িত হয়ে আছে। যেখানে বিনিয়োগ করে ভালো মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ভালো শেয়ারের অভাবে অনেক বিনিয়োগকারী ওইসব অসাধু চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে, এটি একটি কারণ। তাছাড়া, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ শিক্ষার অভাব রয়েছে। তারা না জেনে-বুঝেই দুর্বল শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। এতে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
সম্প্রতি শেয়ারবাজারে ৬২টি উৎপাদন বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে, অর্থাৎ তিন মাসে ওই কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্তত ৪১টির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এরমধ্যে অনেকগুলো কোম্পানির কাছে দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে চিঠিও দিয়েছে ডিএসই। আলোচিত তিন মাসের মধ্যে এসব বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের দামে হঠাৎ বড় উত্থানের পর ধীরে ধীরে পতনও হয়েছে। এতে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে এই দুর্বল কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ উচ্চ ঝুঁকিতে পড়েছে।পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত তিন মাসের মধ্যে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে এসব বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কোনো শেয়ারের দাম ১৮৫ শতাংশ থেকে ২৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ওই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি থামাতে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা প্রকাশের পাশাপাশি ‘রিয়েল-টাইম অ্যাকশন’ হিসেবে তাৎক্ষণিক লেনদেন স্থগিতের মতো সিদ্ধান্তও নেয় ডিএসই। তা সত্ত্বেও থেমে নেই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি। শেষ পর্যন্ত বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির শেয়ারের দাম দিনের সর্বোচ্চ ওঠানামায় সার্কিট ব্রেকারের সীমা কমানোর দাবি জানায় স্টক এক্সচেঞ্জটি। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে দুই শেয়ারবাজার ডিএসই ও সিএসইকে সার্কিট ব্রেকারের সীমা নির্ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এখন পর্যালোচনা করে অস্বাভাবিক উত্থান বন্ধে কোন শেয়ারগুলোতে সার্কিট ব্রেকারের সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হবে, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে স্টক এক্সচেঞ্জ।কোন শেয়ারের দাম কেমন বাড়লো?
গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে উৎপাদন বন্ধ থাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের। এই সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র ৫ এপ্রিল থেকে ৩ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৬ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৯১ টাকা ১০ পয়সায় উঠেছে। আলোচিত সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৬৪ টাকা ৮০ পয়সা বা ২৪৬ শতাংশ। এরপর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমছে।দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরবৃদ্ধি হয় সোনারগাঁও টেক্সটাইলস লিমিটেডের শেয়ারে। গত ১০ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৬২ টাকা ৮০ পয়সা বা ১৮৫ শতাংশ বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে শেয়ারটি ৩৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৯৬ টাকা ৭০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের শেয়ারদর ৩০ এপ্রিল থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৭ টাকা ৯০ পয়সায় উঠেছে। এই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর বৃদ্ধি পায় ৪ টাকা বা ১০৩ শতাংশ। এরপর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমছে।
বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের শেয়ারদর গত ৬ এপ্রিল থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত ১৬ টাকা ৬০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা ৯০ পয়সায় উঠেছে। এই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৪ টাকা ৩০ পয়সা বা ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। পরে কয়েকদিনের দরপতনে গত ৩০ জুন শেষে শেয়ারটির দাম কমে ২৫ টাকা ১০ পয়সায় নেমে এসেছে। আর শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেডের শেয়ারদর গত ১৯ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১১১ টাকা ৯০ পয়সা বা ৮১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৩৮ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ২৫০ টাকা ৮০ পয়সায় উঠেছে।
এছাড়া দুলামিয়া কটনের (৫ এপ্রিল-৩০ জুন) শেয়ারদর ৯০ টাকা ৭০ পয়সা বা ৮০ শতাংশ বেড়ে ২০৪ টাকা ২০ পয়সায়, আনলিমা ইয়ার্নের (২১ এপ্রিল-১৭ জুন) শেয়ারদর ১৫ টাকা ২০ পয়সা বা ৮০ শতাংশ বেড়ে ৩৪ টাকা ৩০ পয়সায়, এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের (৩ মে-৪ জুন) শেয়ারদর ১০ টাকা ৯০ পয়সা বা ৭৮ শতাংশ বেড়ে ২৪ টাকা ৮০ পয়সায়, আজিজ পাইপস লিমিটেডের (৬ এপ্রিল-২৪ জুন) শেয়ারদর ৩৫ টাকা ২০ পয়সা বা ৭৫ শতাংশ বেড়ে ৮২ টাকা ৩০ পয়সায় এবং ইয়াকিন পলিমারের (৯ এপ্রিল-১ জুন) শেয়ারদর ১০ টাকা ৪০ পয়সা বা ৬৩ শতাংশ বেড়ে ২৬ টাকা ৮০ পয়সায় উঠেছে। এরপর থেকে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ধারাবাহিকভাবে কমছে।
আর কয়েকদিনের ব্যবধানে মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর ৫৮ শতাংশ, সাফকো স্পিনিংয়ের ৫৩ শতাংশ, হামিদ ফেব্রিক্সের ৪৪ শতাংশ, ইন্দো বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালসের ৪৩ শতাংশ এবং উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির শেয়ারদর ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পরে অবশ্য এসব বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের দামও ধীরে ধীরে কমছে।
এর বাইরে অ্যাকটিভ ফাইন, আরামিট সিমেন্ট, খুলনা পাওয়ার, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, নিউ লাইন ক্লোথিং, নর্দান জুট, প্যাসিফিক ডেনিমস, রহিম টেক্সটাইল, আরএসআরএম স্টিল, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, বারাকা পাওয়ার, জিবিবি পাওয়ার, মেট্রো স্পিনিং, মিথুন নিটিং, জিলবাংলা, আল-টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, সেন্ট্রাল ফার্মা, ঢাকা ডায়িং, ডরিন পাওয়ার, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যাল, ন্যাশনাল টি, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, তাল্লু স্পিনিং এবং জাহিন স্পিনিং লিমিটেডের শেয়ারদর গত তিন মাসের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেখা যায়। অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পর এই শেয়ারগুলোর দামও ধীরে ধীরে কমে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়েছে।
দুর্বল শেয়ারে সার্কিট ব্রেকারের সীমা কমানোর সিদ্ধান্ত
বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক দাম ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে প্রথমে বিনিয়োগাকারীদের উদ্দেশ্যে সতর্ক বার্তা প্রকাশ করে ডিএসই। পাশাপাশি সম্প্রতি দীর্ঘ এক দশক পর ‘রিয়েল-টাইম অ্যাকশন’ পদ্ধতিও ফিরিয়ে এনেছে স্টক এক্সচেঞ্জটি। এই পদ্ধতিতে অস্বাভাবিক উত্থান ও লেনদেন ঠেকাতে তাৎক্ষণিক একদিনের জন্য লেনদেন কার্যক্রম স্থগিত করা হচ্ছে। এতেও কার্যকারী ফল না আসায় শেষ পর্যন্ত গত ১১ জুন বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক দাম ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে দৈনিক সার্কিট ব্রেকার বা মূল্য পরিবর্তনের সীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেয় ডিএসই।ওই আবেদনের পরিপেক্ষিতে বুধবার (৩০ জুন) দুই শেয়ারবাজার ডিএসই ও সিএসইকে সার্কিট ব্রেকারের সীমা নির্ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এখন পর্যালোচনা করে অস্বাভাবিক উত্থান বন্ধে কোন শেয়ারগুলোতে সার্কিট ব্রেকারের সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হবে, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে স্টক এক্সচেঞ্জ। বর্তমানে শেয়ারবাজারের সব কোম্পানির ক্ষেত্রে দৈনিক শেয়ারদর ওঠানামায় সার্কিট ব্রেকারের সীমা রয়েছে ১০ শতাংশ। অর্থাৎ একটি শেয়ারের দাম একদিনে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বাড়তে বা কমতে পারে। দুর্বল কোম্পানির ক্ষেত্রে এই সীমা কমিয়ে অর্ধেক তথা ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
ডিএসই মনে করে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে দুর্বল আর্থিক অবস্থার কোম্পানিগুলোর শেয়ারে অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনা ও অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও পতনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মূল্য কারসাজির সুযোগ কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি হ্রাসেও সহায়ক হবে।
তবে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আল-আমিন মনে করেন, দুর্বল বা লোকসানি কোম্পানির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক ওঠানামা ঠেকাতে সার্কিট ব্রেকার সীমা কমানোর প্রস্তাব স্বল্পমেয়াদে কিছু নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে। তবে এটি সমস্যার মূল সমাধান নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ কোম্পানির দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সংকট ও পরিচালনা পর্ষদের অকার্যকারিতা।
তিনি আরো বলেন, শুধু শেয়ারের দামের গতি নিয়ন্ত্রণ করে কোম্পানিকে সুস্থ করা সম্ভব নয়। বরং কোম্পানিগুলোর অবস্থা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন হলে বোর্ড পুনর্গঠন, নীতিগত সহায়তা এবং কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
প্রকৃত সমাধান তাহলে কোথায়
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেটের (বিআইসিএম) নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ওয়াজিদ হাসান শাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের বিষয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়াতে বিনিয়োগ শিক্ষার বিকল্প নেই। আমরা বিআইসিএমের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিনিয়োগ শিক্ষার পরিধি বাড়াতে কাজ করছি। আমাদের শেয়ারবাজারে অনেক বিনিয়োগকারীই স্বল্প সময়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ রিটার্ন নেওয়ার মানসিকতা রাখেন, যেটি বাস্তবসম্মত নয়। যারা এই ধরনের লোভ করেন, তাদের একশ্রেণি বারবার লোকসান করার পরও আবারো দুর্বল শেয়ারে ঝুঁকি নেন। বস্তুতপক্ষে ওইসব শেয়ারে একটি চক্র বড় রিটার্ন নেওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঘাড়ে ঝুঁকি চাপিয়ে দেওয়া হয়।তিনি আরও বলেন, যেসব কোম্পানিতে দীর্ঘ বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, সেগুলো তালিকাচ্যুত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে দেখার বিষয় হলো- তালিকাচ্যুত করা হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে যাবেন কিনা? তাদের বিনিয়োগের ন্যূনতম অংশ হলেও ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে তালিকাচ্যুতর পথে এগোতে হবে। অন্যথায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাঁচটি ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ হওয়ায় শেয়ারবাজারে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, সেই প্রভাব আবারও পড়তে পারে।
এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রিয়েল-টাইম অ্যাকশন’ হিসেবে একদিনের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করা সমাধান নয়। বন্ধ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন স্থায়ীভাবে স্থগিত রাখা উচিত। অন্তত যতদিন ওই কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম সচল না হয়, ততদিন বন্ধ রাখা উচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হলে লেনদেনও বন্ধ রাখা হয়। আর একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর যদি উৎপাদন সচল না হয়, তাহলে ওই কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করা হয়।
তিন বলেন, ডিএসই ও বিএসইসি চাইলে এসব কোম্পানির শেয়ার লেনদেন আগেই স্থগিত করতে পারত। তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আবার ঝুঁকিতে পড়তেন না। একইসঙ্গে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা তলব, পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা বিকল্প সমাধানের পথও খোঁজা যেত। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়া নিয়ন্ত্রকের অন্যতম দায়িত্ব। তাই বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

