জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে নাহিদ ও নাসিম জমজ দুই ভাই এবার অংশগ্রহণ করেছে এসএসসি পরীক্ষায়। দুই ভাই এক সঙ্গেই বড় হয়েছে পারিবারিক দারিদ্র্যতা এবং বাবা ও ভাই হারানো শোকের মধ্যে দিয়ে। তবে নাহিদের জীবনের সংগ্রাম ভিন্ন। জন্ম থেকেই তার ডান হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ নেই।তবুও বাড়তি কোনো সুবিধা না নিয়েই বাম হাতেই এসএসসি পরীক্ষায় নিজের ভবিষ্যৎ লিখছে সে।মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, চার নম্বর কক্ষে বাম হাতে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে নাহিদ। ডান হাত কুনুইয়ের নিচ থেকে নেই। অন্যান্য সুস্থ ও স্বাভাবিক পরীক্ষার্থীর মতোই বাম হাতে অনর্গল লিখে যাচ্ছে সে।দেখে বোঝার উপায় নেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধী।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সে আক্কেলপুর পৌর এলাকার শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম ও নাসিমা বিবি দম্পতির ছেলে। নাহিদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে সাত বছর আগে, যখন তার বাবা নুরুল ইসলাম ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তিন বছর আগে মারা যান তার বড় ভাই মোজাম্মেল হোসেন।একের পর এক প্রিয়জন হারিয়ে পরিবারটি যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে। বর্তমানে নাহিদ ও তার জমজ ভাই নাসিমকে নিয়ে সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তাদের মা নাসিমা বিবি। জমিজমা বলতে কিছুই নেই। সংসার চালাতে তিনি আলুর চিপস তৈরি করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অভাব-অনটনের মাঝেই বড় হয়েছে দুই ভাই।তাদের মধ্যে নাহিদ শারীরিক প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই ডান হাত নেই। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বাম হাত দিয়ে লিখেই সে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তার জমজ ভাই নাসিম সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক, সেও একই সঙ্গে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।নাহিদ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হলেও সাংসারিক এবং প্রয়োজনীয় সকল কাজ করতে পারে। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন প্রতি শ্রেণিতেই মেধার পরিচয় দিয়েছে। সে প্রমাণ করতে চায় ইচ্ছা আর প্রচেষ্টার কাছে প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে সব সুবিধা পাচ্ছে নাহিদ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সে ভালো করেছে আর এবারও ভালো ফলাফল করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব মো. আব্দুল মোমিন বলেন, নাহিদ বাম হাত দিয়ে খুব সুন্দরভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে। সে শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে বাড়তি কোনো সুযোগ সুবিধা নেয়নি। তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তার মনোবল দেখে আমরা মুগ্ধ।এসএসসি পরীক্ষার্থী নাহিদ বলেন, জন্ম থেকেই আমার ডান হাত নেই। আমি বাম হাত দিয়েই সকল কাজকর্ম করতে পারি। প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। বাম হাতে লিখে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি এখন পর্যন্ত পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। আমি প্রমাণ করতে চাই প্রতিবন্ধিতা কোনো বাধা নয়।কথা হয় তার মা নাসিমা বিবির সঙ্গে। তিনি বলেন, ছোট থেকেই নাহিদ পড়ালেখায় ভালো। তার ডান হাত না থাকলেও সংসারের সকল কাজ করে পরিবারে সহযোগীতা করে আসছে। সে কখনো নিজেকে প্রতিবন্ধী বা শারীরিক অক্ষম মনে করে না। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে মেজো। পরিবারে অভাব থাকায় তাকে নিয়ে চিন্তিত। তাদের বলেছি পরীক্ষার পরে তাদের আর পড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তারা অন্যের দোকানে কাজ করে হলেও নিজে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়।আক্কেলপুর সরকারি ফজর উদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন বলেন, নাহিদ মেধাবী ও পরিশ্রমী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সে যেভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। সে হার মানতে নারাজ। ভবিষ্যতে সে অনেক ভালো পর্যায়ে যাবে বলে মনে করি।
/ইমন খান

