etcnews
ঢাকাThursday , 5 November 2026
  1. অনিয়ম
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ইসলাম
  5. উন্নয়ন
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলা
  8. জাতীয়
  9. নির্বাচন
  10. প্রতিবাদ
  11. প্রযুক্তি
  12. বানিজ্য
  13. বিনোদন
  14. বিশ্ব
  15. রাজনীতি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কাদাপানিতে জীবনসংগ্রাম, কুঁচিয়া শিকারেই জীবিকা

etcnews
November 5, 2026 10:45 am
Link Copied!

মো.ফাহিম,চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি:
সকাল থেকে সন্ধ্যা। কখনো কোমর সমান পানি, কখনো হাঁটুভরা কাদামাটি। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন জলাভূমিতে নেমে কুঁচিয়া শিকার করেন তাঁরা। কারও হাতে বাঁশের তৈরি ফাঁদ, কারও হাতে কুঁচিয়া ধরার সরঞ্জাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রমের পর যা পাওয়া যায়, তা বিক্রি করেই চলে সংসার। সেই আয়ে জোটে দুবেলা খাবার, চলে সন্তানদের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। জীবনের ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করেই এভাবেই দিন কাটছে চরাঞ্চলের দরিদ্র কুঁচিয়া শিকারিদের।তাঁদের কাছে কুঁচিয়া শিকার নিছক পেশা নয়, বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওসমানগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয় ও আশপাশের এলাকায় দেখা যায় এমন জীবনসংগ্রামের চিত্র। স্থানীয়ভাবে কুঁচিয়া শিকারকে কেউ বলেন ‘কুঁচি ধরা’, আবার কেউ বলেন ‘কুঁচিয়া মারা’। দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই তাঁদের অনেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ পেশায় যুক্ত রয়েছেন।

এমনই একজন কুঁচিয়া শিকারি অবিনাশ সরকার। তাঁর সঙ্গে একই পেশায় যুক্ত রয়েছেন হরিপদ সরকারের মতো আরও অনেকে। অভাবের সংসারে অন্য কাজের সুযোগ না থাকায় বছরের পর বছর জলাশয়ে কুঁচিয়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তাঁরা।

অবিনাশ সরকার বলেন, ‘কুঁচিয়া ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করি। প্রতিদিন জলাশয়ে নামতে হয়। কোনো দিন বেশি কুঁচিয়া পাই, আবার কোনো দিন অনেক কষ্ট করেও তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তারপরও পেটের তাগিদে এ কাজ করতে হয়। অন্য কোনো কাজের ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এভাবে কষ্ট করতে হতো না।’

একই পেশায় নিয়োজিত হরিপদ সরকার বলেন, ‘কুঁচিয়া শিকার করা সহজ কাজ নয়। কাদাপানি ও জলাশয়ে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে হয়। কুঁচিয়া বেশি পেলে কিছুটা স্বস্তি মেলে, আর কম পেলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আমাদের মতো দরিদ্র মানুষের জন্য নিয়মিত কাজের সুযোগ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে অনেক উপকার হতো।’

কুঁচিয়া শিকারে ব্যবহার করা হয় বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এগুলো ‘দোয়াইর’ বা ‘কাঁদা’ নামে পরিচিত। বাঁশ-বেত ও প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে তৈরি এসব ফাঁদ জলাশয়ের কাদামাটি ও গাছপালার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে বসানো হয়। পরে ফাঁদে কুঁচিয়া প্রবেশ করলে তা সংগ্রহ করেন শিকারিরা।

জলাশয়ের গভীরতা, কাদার ধরন ও কুঁচিয়ার বিচরণস্থল বুঝে ফাঁদ বসাতে হয়। এ কাজে প্রয়োজন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে জলাশয়ের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে শিকারিদের কাজের ধরনও বদলে যায়। তবে তাঁদের আয় নির্ভর করে প্রতিদিনের সংগ্রহের ওপর। ফলে কোনো দিন ভালো আয় হলেও কোনো দিন খালি হাতেই ফিরতে হয়।

সংগৃহীত কুঁচিয়া স্থানীয় বাজার ও পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন শিকারিরা। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কুঁচিয়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে মৌসুম, আকার, চাহিদা ও বাজারভেদে দাম কমবেশি হয়। ওসমানগঞ্জের লতিফ মিয়ার হাটসহ আশপাশের বাজারগুলোতে চলে কুঁচিয়ার কেনাবেচা। স্থানীয় পাইকাররা শিকারিদের কাছ থেকে কুঁচিয়া সংগ্রহ করে চাহিদা অনুযায়ী অন্য বাজারে সরবরাহ করেন।

কুঁচিয়ার পাইকার হালিম মুন্সি বলেন, ‘স্থানীয় শিকারিরা জলাশয় থেকে কুঁচিয়া ধরে আমাদের কাছে বিক্রি করেন। এরপর চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো অন্য বাজারে সরবরাহ করা হয়। কুঁচিয়ার দাম ও চাহিদা সব সময় এক রকম থাকে না। শিকারিরা ন্যায্যমূল্য পেলে তাঁদের কষ্ট কিছুটা সার্থক হবে। এ ব্যবসাকে আরও ভালোভাবে এগিয়ে নিতে সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের উন্নত ব্যবস্থা প্রয়োজন।’

স্থানীয়ভাবে কুঁচিয়া শিকারি ও পাইকারদের মধ্যে গড়ে উঠেছে কেনাবেচার একটি অর্থনৈতিক চক্র। তবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় এ খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শিকারিরা সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ পেলে তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

কুঁচিয়া শুধু স্থানীয় মানুষের জীবিকার উপকরণ নয়, এর রয়েছে বাণিজ্যিক গুরুত্বও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুঁচিয়ার চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে জলাভূমিনির্ভর এ পেশা গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কুঁচিয়া সাধারণত জলাশয়, বিল, খাল ও কাদাযুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে।তবে কুঁচিয়ার প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় শিকারিদের জীবিকা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কারণে দেশীয় জলজ প্রাণীর বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে কুঁচিয়ার প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর ওপর।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জলাভূমি সংরক্ষণ, কুঁচিয়ার প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, শিকারিদের প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত হতে পারে। চরাঞ্চলের এসব কুঁচিয়া শিকারির অধিকাংশই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের নেই স্থায়ী কর্মসংস্থান, নেই সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। অথচ তাঁদের শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় জলজ সম্পদ আহরণ ও বাজার অর্থনীতির একটি অংশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কুঁচিয়া শিকারিদের তালিকা তৈরি, সহজ শর্তে ঋণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, নিরাপদ সংগ্রহব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলাভূমির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

পেটের দায়ে প্রতিদিন যাঁরা জলাশয়ের কাদামাটিতে নেমে কুঁচিয়া খোঁজেন, তাঁদের কাছে এ কাজই জীবনের সম্বল। জলাশয়ের পানি আর কাদামাটির সঙ্গে মিশে আছে তাঁদের বেঁচে থাকার গল্প। চরফ্যাশনের এসব প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। তাঁদের শ্রমের স্বীকৃতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও জীবিকার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

এই সাইটে কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।