পাকিস্তানের হাইকোর্টের অন্যতম পরিচিত বিচারপতি মোহসিন কায়ানি বুধবার পদত্যাগ করেছেন। নিজের বিবেকের তাড়নায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন তিনি।গত বছরের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মনসুর আলী শাহ ও আতহার মিনাল্লাহ এবং লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি শামস মাহমুদ মির্জা পদত্যাগ করেছিলেন। বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীর পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে পদ ছাড়েন তাঁরা। কায়ানির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে একই কারণে পদত্যাগ করা বিচারপতির সংখ্যা দাঁড়াল চারজনে।
পাকিস্তানের ২৬তম ও ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর সমালোচনা করে পদত্যাগপত্রে কায়ানি লিখেছেন, এসব পরিবর্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।তিনি লিখেছেন, ‘বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ আমি প্রত্যক্ষ করেছি। বিচারকদের নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রেও এই নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হয়েছে। আমার বিবেচনায়, এ ধরনের হস্তক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনসাধারণের আস্থা গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।’
সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কায়ানি।তাঁর মতে, যে ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য মানুষের বিচার নিশ্চিত করা, সেখানে প্রায়ই বিচারপ্রার্থীদের প্রয়োজন উপেক্ষিত হয়েছে।
পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, ‘এ পরিস্থিতিতে আমার বিবেক আমাকে বিচারকের আসনে থাকতে দিচ্ছে না।’
বিচারকের পদ ছাড়ার পর আবার আইন পেশায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এর মাধ্যমে মানুষের অধিকার রক্ষা ও আইনি সচেতনতা বাড়ানোর কাজে যুক্ত থাকতে চান কায়ানি।
নির্বাহী বিভাগ বনাম বিচার বিভাগ
২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন কায়ানি।গত ২৯ এপ্রিল তাঁকে লাহোর হাইকোর্টে বদলি করা হয়। এতে ওই আদালতের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তাঁর অবস্থান নেমে আসে ১২ নম্বরে। ইসলামাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও তাঁকে বিবেচনা করা হতো।
লাহোর হাইকোর্ট থেকে বিচারপতি সরদার মুহাম্মদ সরফরাজ দোগরকে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এ ছাড়া সিন্ধু ও বেলুচিস্তান হাইকোর্ট থেকেও দুজন বিচারপতিকে বদলি করা হয়।
আন্ত হাইকোর্ট বদলির এসব সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেন কায়ানি ও অন্য বিচারকেরা। তবে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ দোগরসহ বিচারকদের বদলি বহাল রাখেন। সংবাদমাধ্যম ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রায় হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের ক্ষমতা এবং মামলার শুনানির জন্য বিচারক নির্ধারণের প্রশাসনিক এখতিয়ার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে কায়ানি ও ইসলামাবাদ হাইকোর্টের অন্য জ্যেষ্ঠ বিচারকেরা প্রধান বিচারপতি দোগরের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আদালতের প্রশাসন কার্যত ‘এক ব্যক্তির শাসনে’ পরিণত হয়েছে। প্রধান বিচারপতি নিজের বিবেচনায় বিচারকদের মামলা শুনানি থেকে বাদ দিতে পারছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
লাহোর হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হওয়া সত্ত্বেও কায়ানিকে কোনো ডিভিশন বেঞ্চে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। পদত্যাগের কয়েক দিন আগে আদালতের বিচারিক কার্যতালিকায় পরিবর্তন আনার পর তিনি ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডি এলাকায় ফিরে যান। সেখানে হাইকোর্টের রাওয়ালপিন্ডি বেঞ্চে একক বিচারপতির বেঞ্চে দায়িত্ব পান। নতুন কার্যতালিকায় তাঁকে কেবল ওই বেঞ্চের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বিচার বিভাগে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ নিয়ে সরব ছিলেন কায়ানি
বিচার বিভাগে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন কায়ানি। ২০২৪ সালের মার্চে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের যে ছয় বিচারপতি দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে বিচারিক কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন তিনি।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সদস্যদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিচারকেরা তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টির নানা ঘটনার বিবরণ দেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, বিচারকদের আত্মীয়স্বজনকে অপহরণ ও নির্যাতন করা এবং তাঁদের বাড়িতে গোপন নজরদারি চালানোর মতো পদ্ধতিতে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা হয়েছে।
জোরপূর্বক গুমের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়েও একাধিক মামলায় দায়িত্ব পালন করেছেন কায়ানি। লাহোর হাইকোর্টের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় আরও কঠোর শাস্তির বিধানসহ আইন সংস্কারের পক্ষে ছিলেন তিনি।বিচারক হওয়ার আগে ইসলামাবাদের আইনজীবী সমাজেও নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন কায়ানি। তিনি ইসলামাবাদ জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ও পরে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইসলামাবাদ হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সংবিধান সংশোধনী ঘিরে বিতর্ক
২০২৪ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের ২৬তম সংবিধান সংশোধনী পাস হয়। এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের ক্ষমতা কমানো হয়। সুপ্রিম কোর্টের নিজ উদ্যোগে কোনো বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও সীমিত করা হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে তিনজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এর ফলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানবিচারপতি নিয়োগের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে।
এরপর সামরিক বাহিনী একটি ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত (এফসিসি) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার দায়িত্ব থাকত এবং সাংবিধানিক বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেওয়া হতো নতুন আদালতকে।
প্রস্তাবটি নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টে পৃথক সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সেই কাঠামোও বদলে দেওয়া হয় এবং ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বর্তমানে পাকিস্তানে দুটি পৃথক সর্বোচ্চ আদালত রয়েছে—সুপ্রিম কোর্ট ও ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত। দুটিরই নেতৃত্বে রয়েছেন পৃথক প্রধান বিচারপতি।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ২৭তম সংশোধনী পাস হওয়ার পরপরই কায়ানি ও বিচারপতি সামান রাফাত ইমতিয়াজ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তাঁরা বিচারকের দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন কি না, তা নিয়ে ভাবছেন।
পদত্যাগপত্রে কায়ানি লিখেছেন, ‘এ পরিস্থিতিতে আমার বিবেক আমাকে বিচারকের আসনে থাকতে দিচ্ছে না। এটি একটি বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত। তবে আমার বিশ্বাস, বিচারকের দায়িত্বের সঙ্গে স্বাধীনতা, সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার বিষয়গুলো অবিচ্ছেদ্য।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘তাই আমি মনে করি, এখন বিচারকের পোশাক খুলে আইন পেশায় ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে। এর মাধ্যমে আমি মানুষের সেবা, তাদের অধিকার রক্ষা এবং আইনি সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

