বাংলাদেশের ইতিহাসে রংপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এ অঞ্চলের ইতিহাস শুধু কৃষি, নদী, মাটি ও মানুষের জীবনযাত্রার ইতিহাস নয়; একই সঙ্গে এটি অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য ও অধিকারবঞ্চনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনামলের কৃষক বিদ্রোহ থেকে শুরু করে তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—বিভিন্ন সময়ে রংপুরের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আর এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার কারণেই রংপুরকে অনেক সময় ‘আন্দোলনের শহর’ বলা হয়।
রংপুরের আন্দোলনের ইতিহাসের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের শুরুর দিকে। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করার পর রংপুরেও নতুন রাজস্বব্যবস্থা চালু হয়। কৃষকদের ওপর বাড়তে থাকে রাজস্বের চাপ ও নানা ধরনের শোষণ। রংপুর জেলা প্রশাসনের ইতিহাসে ১৭৬৫ সালকে এ অঞ্চলের প্রথম কৃষক বিদ্রোহের সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষকরা অন্যায় রাজস্ব ও শোষণের বিরুদ্ধে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন। এই সময় থেকেই রংপুরে কৃষক-প্রজার প্রতিবাদের যে ধারা তৈরি হয়, পরবর্তী সময়ে তা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এর কয়েক বছর পর ১৭৭২ সালে রংপুরের তারাগঞ্জ এলাকায় ফকির-সন্ন্যাসী প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। সরকারি ইতিহাস অনুযায়ী, ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর শ্যামগঞ্জ এলাকায় ফকির-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ইংরেজ বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে ইংরেজ বাহিনীর সেনাপতি টমাস নিহত হন এবং ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রংপুরের মাটিতে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ কতটা শক্তিশালী ছিল, এই ঘটনা তার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
রংপুরের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৭৮৩ সালে। জমিদারি ও রাজস্ব ব্যবস্থার নানা অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক-প্রজারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ করেন। ইতিহাসে এটি রংপুর কৃষক-প্রজা বিদ্রোহ হিসেবে পরিচিত। এই বিদ্রোহের সঙ্গে নূরলদীন বা নূরুল উদ্দিনের নাম বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। স্থানীয় ইতিহাসে জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানী, শিবচন্দ্র রায়, ভবানী পাঠক, দিরাজী নারায়ণ, ইসরাইল খাঁ, মুসা শাহ, দয়াল শাহ ও কেনা সরকারের মতো আরও কয়েকজনের নামও এ সময়ের প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত পাওয়া যায়। রংপুরের বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষক-প্রজাদের মধ্যে এ আন্দোলনের প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই বিদ্রোহ রংপুরের মানুষের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য তৈরি করে।
এরপর ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহ। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এই বৃহৎ বিদ্রোহের প্রভাব রংপুরেও পড়ে। রংপুর জেলা প্রশাসনের ইতিহাসে এ অঞ্চলের বিদ্রোহী সিপাহিদের ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ কৃষক বিদ্রোহের পরও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রংপুরের প্রতিরোধের ধারাটি থেমে যায়নি।
১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতবর্ষজুড়ে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হলে তার প্রভাবও রংপুরে এসে পড়ে। ব্রিটিশবিরোধী এ আন্দোলনে রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সভা, মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। রংপুরের মানুষের মধ্যে তখন রাজনৈতিক সচেতনতা আরও বিস্তৃত হতে থাকে। কৃষকের অর্থনৈতিক অধিকার থেকে আন্দোলনের বিষয় ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যায়।
তবে রংপুরের আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো ১৯৪৬–৪৭ সালের তেভাগা আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিল মূলত ভাগচাষিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তখন জমিতে চাষ করতেন যে ভাগচাষিরা, তাঁরা উৎপাদিত ফসলের বড় অংশের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। তাঁদের দাবি ছিল, জমির মালিককে অর্ধেক ফসল দেওয়ার পরিবর্তে উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ চাষি পাবেন এবং এক ভাগ পাবেন জমির মালিক। এই দাবিই ‘তেভাগা’ নামে পরিচিত হয়।
১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে রংপুরে উত্তরবঙ্গের কৃষক নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নভেম্বর মাসে রংপুর অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলন ব্যাপকভাবে শুরু হয়। রংপুরের বিভিন্ন গ্রাম ও কৃষিপ্রধান এলাকায় ভাগচাষিরা সংগঠিত হতে থাকেন। কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ধান নিজেদের গোলায় তোলার দাবি জানান। আন্দোলন দমন করতে জমিদার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা চাপ সৃষ্টি করা হলেও কৃষকদের প্রতিরোধ থামেনি।
তেভাগা আন্দোলনে রংপুরের বিভিন্ন এলাকার কৃষক নেতা ও সংগঠকদের মধ্যে মণিকৃষ্ণ সেনের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক স্থানীয় নেতা ও কর্মী কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন। এ আন্দোলনে শুধু পুরুষ কৃষকরাই নয়, গ্রামের নারীরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। অনেক নারী মিছিল, সভা ও কৃষকদের আন্দোলনে সহযোগিতা করেন। ফলে তেভাগা আন্দোলন রংপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিকার সচেতনতার একটি বড় ভিত্তি তৈরি করে।
এরপর রংপুরের আন্দোলনের ইতিহাস নতুন মোড় নেয় ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। ১৯৪৮ সাল থেকেই রংপুরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। কারমাইকেল কলেজ এ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ শিক্ষার্থীরা ধর্মঘট পালন করেন এবং মিছিল ও সমাবেশ করেন। রংপুর জিলা স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে অংশ নেন।
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য দিলে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে অনেকেই প্রশাসনের রোষানলে পড়েন। ছাত্রনেতা নুরুল ইসলামকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ দেবেন্দ্র প্রসাদ ঘোষও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং পরবর্তীতে পদত্যাগ করে ভারত চলে যান।
১৯৫১ সালে রংপুরের ভাষা আন্দোলনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থী নেত্রী মিলি চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মিছিল রংপুর জজ কোর্টে যায়। আদালতে ইংরেজিতে রায় লেখার প্রতিবাদে তিনি বিচারকের এজলাসে গিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে বিচারকের কলম ভেঙে মিছিলে ফিরে আসার ঘটনাটি রংপুরের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। ঘটনাটি প্রমাণ করে, রংপুরে ভাষার দাবি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় বাংলার ব্যবহার নিয়েও মানুষের মধ্যে তীব্র সচেতনতা তৈরি হয়েছিল।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে রংপুরও উত্তাল হয়ে ওঠে। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে আবুল হোসেনকে আহ্বায়ক করে রংপুরে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এতে যুক্ত হন। মতিউর রহমান, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, আব্দুল গনি, আব্দুস সোবহান, খন্দকার আজিজার রহমান, মোতাহার হোসেন সুফি, শাহ আব্দুর রাজ্জাক, মো. আফজাল, সিদ্দিক হোসেন, শাহ তোফাজ্জল হোসেন, আবেদ আলী ও মিলি ভট্টাচার্যসহ অনেকের নাম রংপুরের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের খবর রংপুরে পৌঁছালে শহরে প্রতিবাদের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। মিছিল, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর শহর। পুলিশ আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। ভাষা আন্দোলনের এই অভিজ্ঞতা রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অধিকারচেতনায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও রংপুরে গণতান্ত্রিক আন্দোলন জোরদার হয়। পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা নির্বাচনী রাজনীতির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। রংপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী তখন গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। রংপুরের রাজনৈতিক কর্মীরাও এর বাইরে ছিলেন না। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়। মণিকৃষ্ণ সেনসহ অনেক নেতা সামরিক শাসনবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ফলে রংপুরে আন্দোলনের ধারাটি আবারও গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি উত্থাপন করলে পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন নতুন গতি পায়। ছয় দফা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। সারা দেশের মতো রংপুরেও ছয় দফার পক্ষে রাজনৈতিক প্রচার ও জনমত গড়ে ওঠে। ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে এ দাবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৬৯ সালে ছাত্রসমাজের ১১ দফা এবং ছয় দফাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। রংপুরেও ছাত্র-জনতা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। বিভিন্ন সভা, মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। মণিকৃষ্ণ সেন, আমজাদ হোসেন, জিতেন দত্ত, মাহফুজ আলী জররেজ, পাখি মৈত্র, ভিকু চৌধুরী, কাজী এহিয়া, মো. আফজালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব রংপুরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় ১৯৭১ সালের মার্চে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। রংপুরেও তখন মানুষ কার্যত পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অসহযোগ শুরু করে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাজপথে আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি হয়। ছাত্র-জনতা স্বাধীনতার দাবিতে আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ রংপুরে ঘটে একটি ঐতিহাসিক ও মর্মান্তিক ঘটনা। সেদিন হরতালের সমর্থনে রংপুর শহরে বিশাল মিছিল বের হয়। আলমনগর স্টেশন রোড এলাকায় মিছিলের ওপর গুলি চালানো হলে কিশোর শংকু সমজদার নিহত হন। রংপুর জেলা প্রশাসনের ইতিহাসে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শংকুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রংপুরে প্রতিবাদ আরও তীব্র হয় এবং মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
এরপর ২৪ মার্চ থেকে রংপুর অঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু হয়। ২৮ মার্চ রংপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি। সেদিন বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ লাঠি, বল্লম, দা, কুড়াল, তীর-ধনুকসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে এগিয়ে যান। সরকারি ইতিহাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের এই বিশাল প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলি চালায়। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, রংপুরের আন্দোলন তখন আর শুধু সভা-মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা স্বাধীনতার জন্য সরাসরি প্রতিরোধে রূপ নিয়েছিল।
এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। রংপুরের মানুষ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেন। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় গণহত্যা, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ চালায়। দখিগঞ্জ, বলারখাইল, ঝাড়ুদার বিল, পদ্মপুকুর, সাহেবগঞ্জ, লাহিড়ীরহাট, ঘাঘটপাড়, নিসবেতগঞ্জ, দমদমা ব্রিজ ও জাফরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস রয়েছে।
রংপুর টাউন হলও পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। কারমাইকেল কলেজেও শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন, অধ্যাপক রামকৃষ্ণ অধিকারী ও অধ্যাপক সুনীল চক্রবর্তীসহ কয়েকজন শিক্ষককে হত্যা করার তথ্য রংপুরের সরকারি ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। রংপুরের মানুষও দীর্ঘ আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হয়ে ওঠে।
রংপুরের আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এখানে আন্দোলন কোনো একটি সময় বা একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৭৬৫ সালের কৃষক বিদ্রোহ থেকে ১৭৭২ সালের ফকির-সন্ন্যাসী প্রতিরোধ, ১৭৮৩ সালের কৃষক-প্রজা বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলন, ১৯৪৬–৪৭ সালের তেভাগা আন্দোলন, ১৯৪৮–৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি পর্যায়েই রংপুরের মানুষ কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন।
এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি মিল রয়েছে। কখনো কৃষক জমি ও ফসলের ন্যায্য অধিকার চেয়েছেন, কখনো ছাত্র মাতৃভাষার অধিকার চেয়েছেন, কখনো জনগণ গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছেন, আবার কখনো পুরো জাতি স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছে। সময় বদলেছে, দাবির ধরন বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে; কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে মানসিকতা, তা রংপুরের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে।
তাই রংপুরকে ‘আন্দোলনের শহর’ বলা শুধু একটি প্রচলিত কথা নয়। এটি কৃষক, ছাত্র, শিক্ষক, নারী, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অধিকারচেতনার একটি ঐতিহাসিক পরিচয়। নূরলদীনের কৃষক বিদ্রোহ থেকে শংকু সমজদারের আত্মত্যাগ—রংপুরের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় যেন বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদই এই জনপদের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য।
রংপুর তাই শুধু একটি শহরের নাম নয়; বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে এটি একটি দীর্ঘ প্রতিবাদী অধ্যায়ের নাম।
/কানিজ/মোতাহার

