রংপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন তাজহাট জমিদার বাড়ি। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদ শুধু রংপুর নয়, বাংলাদেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। বিশাল প্রাসাদ, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, পাথরের সিঁড়ি, সবুজে ঘেরা পরিবেশ এবং প্রাচীন নিদর্শনসমৃদ্ধ জাদুঘরের কারণে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন।
রংপুর শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে মাহিগঞ্জের তাজহাট এলাকায় অবস্থিত এই জমিদার বাড়ি। বর্তমানে ঐতিহাসিক প্রাসাদটির দ্বিতীয় তলায় পরিচালিত হচ্ছে রংপুর জাদুঘর। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত এই স্থাপনাটি রংপুরের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত।
তাজহাট নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বর্ণ ও রত্ন ব্যবসার ইতিহাস। রংপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মান্নানলাল রায়। তিনি পাঞ্জাব থেকে রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকায় এসে হীরা, জহরত ও স্বর্ণের ব্যবসা শুরু করেন। স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়, তিনি বিভিন্ন মূল্যবান পাথর ও রত্নখচিত ‘তাজ’ বা মুকুটের ব্যবসা করতেন। সেই তাজ বিক্রির জন্য এখানে যে হাট গড়ে ওঠে, পরবর্তী সময়ে সেটিই ‘তাজহাট’ নামে পরিচিতি পায়।
পরবর্তীতে মান্নানলাল রায়ের উত্তরসূরিদের হাতে জমিদারির বিস্তার ঘটে। তাজহাট জমিদার বাড়ির সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত নাম মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তাঁর উদ্যোগেই বর্তমান প্রাসাদটি নির্মিত হয়। ট্যুরিস্ট পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার রাজমিস্ত্রির দীর্ঘ পরিশ্রমে প্রাসাদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় এবং ১৯১৭ সালে এটি পূর্ণতা লাভ করে।
তাজহাট জমিদার বাড়ির স্থাপত্যে ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশাল সম্মুখভাগ, প্রশস্ত সিঁড়ি, স্তম্ভ, বারান্দা ও অলংকরণ প্রাসাদটির রাজকীয় সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভবনের উত্তর-দক্ষিণ অংশের পরিমাপ প্রায় ১২৩ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিম অংশের পরিমাপ প্রায় ১২০ ফুট। দ্বিতীয় তলায় ওঠার জন্য রয়েছে একাধিক সিঁড়ি, যার মধ্যে সামনের বিশাল সিঁড়িটি বিশেষভাবে দৃষ্টিনন্দন।
ট্যুরিস্ট পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রাসাদটি লাল ইট, শ্বেত ও চুনাপাথর দিয়ে নির্মিত। ইতালীয় মার্বেল পাথরের তৈরি ৩১টি সিঁড়ির কথাও উল্লেখ রয়েছে। প্রাসাদের চারপাশে রয়েছে গাছপালা, বড় মাঠ, ফুলের বাগান এবং পুকুর। সব মিলিয়ে স্থাপনাটির পরিবেশে পুরোনো রাজকীয় আবহ এখনো স্পষ্ট।
জমিদারি প্রথার অবসানের পরও তাজহাট জমিদার বাড়ির গুরুত্ব কমেনি। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটিকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে নথিভুক্ত করে। পরে ২০০৫ সালে রংপুর জাদুঘরকে তাজহাট জমিদার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়।
বর্তমানে জাদুঘরে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। টেরাকোটা শিল্পকর্ম, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ নানা প্রত্নসম্পদ দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শন করা হয়। ট্যুরিস্ট পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জাদুঘরে প্রায় ৩০০টি মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে প্রাচীন আরবি ও সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি এবং কালো পাথরের বিষ্ণুমূর্তির মতো উল্লেখযোগ্য নিদর্শনও রয়েছে।
তাজহাট জমিদার বাড়ি বর্তমানে রংপুরের অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। ইতিহাস ও স্থাপত্যের পাশাপাশি এর সবুজ পরিবেশও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। রংপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জমিদার বাড়ির সামনে রয়েছে চারটি বড় পুকুর এবং পুরো এলাকা গাছপালায় ঘেরা।
তাজহাট জমিদার বাড়ি ও রংপুর জাদুঘর দেখতে বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ টিকিটের মূল্য ৩০ টাকা। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য টিকিটের মূল্য ১০ টাকা। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো টিকিট লাগে না। সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য ২০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য ৪০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে বলে রংপুর ট্যুরিস্ট পুলিশের তথ্য থেকে জানা যায়।
ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাজহাট জমিদার বাড়ি ও রংপুর জাদুঘর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। দুপুর ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত মধ্যাহ্ন বিরতি থাকে। প্রতি রোববার পূর্ণদিন এবং সোমবার অর্ধদিন জাদুঘর বন্ধ থাকে। সরকারি ছুটির দিনেও পরিদর্শন বন্ধ থাকে। শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত মূল গেট থেকে জমিদার বাড়িতে প্রবেশ বন্ধ থাকে। তবে যাওয়ার আগে সর্বশেষ সময়সূচি ও টিকিটের তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো, কারণ সময়সূচি ও প্রবেশমূল্য পরিবর্তিত হতে পারে।
রংপুর শহর থেকে তাজহাট জমিদার বাড়িতে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ। শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে রিকশা, অটোরিকশা বা অন্যান্য স্থানীয় যানবাহনে তাজহাট এলাকায় যাওয়া যায়। রংপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি ইনস্টিটিউটের পাশে সবুজে ঘেরা এলাকায় জমিদার বাড়িটির অবস্থান।
একসময় যে প্রাসাদ ছিল জমিদার পরিবারের ক্ষমতা, ঐশ্বর্য ও প্রভাবের প্রতীক, সময়ের পরিবর্তনে সেটিই আজ ইতিহাস জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পুরোনো স্থাপত্যের সৌন্দর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং জমিদারি আমলের স্মৃতি মিলিয়ে তাজহাট জমিদার বাড়ি এখন রংপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত দলিল।
শত বছরের বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদ শুধু অতীতের গল্পই বলে না, বরং নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও করে দেয়। তাই তাজহাট জমিদার বাড়ি রংপুরের দর্শনীয় স্থানগুলোর তালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে আছে।
/কানিজ/মোতাহার

