নারায়ণগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ্র আহমেদের নিজ দপ্তরে তার পিতা এসএম মামুনুর রশিদের নামে থাকা ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে একের পর এক কাজ বাগিয়ে নিয়ে এবং সেই কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না করেই শতভাগ বিল উত্তোলন করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যদিও নির্বাহী প্রকৌশলী নিজে দাবি করেছেন, তার বাবা কাজ করলেও এতে কোনো আইনগত বাধা নেই। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, এ ধরণের কাজ তিনি কোনোভাবেই করতে পারেন না।
সরজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে যাওয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সেচ প্রকল্পের দুই নম্বর খালের জঙ্গল-আর্বজনা পরিষ্কার এবং মেরামতের জন্য ১৮ লাখ ২৯ হাজার টাকার কাজ করেছে সরকার এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে সরজমিনে দেখা গেছে, খালের পাশে মাত্র ২৬ কলম ভূঁই ভূখণ্ডে সামান্য কিছু কচুরিপানা পরিষ্কার করা হয়েছে, অথচ এই কাজের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা—যেখানে বাস্তবে হয়তো ১৫০০ টাকা খরচ হওয়ার কথা। এলাকাবাসীর তথ্য, তারা এতদিন মাত্র কয়েকজন লোককে খালের মুখ পরিষ্কার করতে দেখেছেন, এর বাইরে আর কোনো কাজ চোখে পড়েনি।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জের পয়েন্টার রিসোর্স প্রকল্পের আওতায় রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভার টেকপাড়া এলাকায় সেচ খালের একটি স্লুইস গেটের রক্ষণাবেক্ষণ ও তার শিক্ষার এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। তবে অনুসন্ধানে সেখানে আদৌ কোনো স্লুইসগেটের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি, ফলে রক্ষণাবেক্ষণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। স্থানীয় বাসিন্দা নার্গিস আক্তার জানান, গত এক-দুই বছরে এই এলাকায় এ ধরনের কোনো কাজ হতে দেখেননি তিনি। এলাকাবাসী আরও জানান, এই গেটটি প্রায় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে অস্তিত্বহীন। একইভাবে মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মণ্ডল কালিতেও সরকার এন্টারপ্রাইজের কোনো কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, তবু এই প্রতিষ্ঠান শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে পুরো বিল উত্তোলন করে নিয়েছে।
এ ছাড়া মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের যাত্রাপুর পাম্প স্টেশনের মূল খালের পলি ও কচুরিপানা পরিষ্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকার কাজ করে বিল উত্তোলন করেছে সরকার এন্টারপ্রাইজ। এখানেও সরজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরে এ ধরনের কোনো কাজ হতে কেউ দেখেনি। তথ্য অনুযায়ী, সরকার এন্টারপ্রাইজ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত মোট ৪২ লাখ টাকার এমন ভুয়া কাজ দেখিয়ে বিল তুলে নিয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ২৫২ সালের ২২ ডিসেম্বর সরকার এন্টারপ্রাইজ নারায়ণগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সীমিত দরপত্রের জন্য তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা নওগাঁ এবং সায়াব মেসার্স এর ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ্র আহমেদেরও নিজ জেলা নওগাঁ। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন বোর্ডের প্রত্যেক সদস্যকে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে নিশ্চিত করতে হয় যে দরপত্রে তার কোনো আত্মীয় বা বন্ধু অংশগ্রহণ করেনি। কোনো নির্বাহী প্রকৌশলীর বাবার প্রতিষ্ঠান তার অধীনে কোনো কাজ করতে পারে না, এবং কাজ না করে বিল তোলা আরও বড় ধরনের অপরাধ বলে তারা মন্তব্য করেছেন।
জানা গেছে, শুভ্র আহমেদ ২০১৬ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডে (পাউবো) যোগদান করেন। তবে ২০১৯ সালেই তিনি মানব সম্পদ পরিদপ্তরের নিয়োগ শাখার একটি স্পর্শকাতর দায়িত্বে যুক্ত হন, যেখান থেকে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, টাইপিং ও প্রিন্টিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি হয়। ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাউবোর নিয়োগ পরীক্ষাগুলো অভ্যন্তরীণভাবে পরিচালিত হতো, আর এই সময়েই প্রশ্নপত্র টাইপিং-প্রিন্টিংয়ের দায়িত্বে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার প্রশ্নের বিনিময়ে অর্থ লেনদেন করা হয়েছে। একাধিক পরীক্ষার্থী ও দালালদের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। নিয়োগ শাখায় কর্মরত শুভ্র আহমেদের কাছে একটি অলিখিত অর্থ উপার্জনের কেন্দ্র পরিণত হয়েছিল, যেখানে চাকরি পেতে যোগ্যতার চেয়ে টাকা ও যোগাযোগই ছিল প্রধান নিয়ামক।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকজন তাকে আলোচিত প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিতে জড়িত সাবেক পিএসসির আবেদ আলীর সাথে তুলনা করেছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এমন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শুভ্র আহমেদ পদোন্নতি পেয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, মেধানুক্রম উপেক্ষা করে বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীর পদে উন্নীত হন, যা পাউবোর ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে দাবি করা হয়েছে।
এরপরই তাকে গুরুত্বপূর্ণ জেলা নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি একটি টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং পরিচালন বাজেটের টেন্ডার নিজের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের পাইয়ে দেন। রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তবে বাস্তবতা হলো, শুষ্ক মৌসুমেও নারায়ণগঞ্জের বহু এলাকায় জলাবদ্ধতা কমেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ—কাজ হয়েছে কেবল কাগজে-কলমে, মাঠপর্যায়ে তার কোনো সুফল প্রতিফলিত হয়নি।
শুভ্র আহমেদের সম্পদের একটি বিস্তৃত তালিকা। জানা গেছে, ২০২২ সালে নিজ জেলা নওগাঁয় তিনি একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জে রয়েছে তার ১৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। এ ছাড়া ঢাকা ও গাজীপুরে তার নামে-বেনামে একাধিক প্লট, জমি, একটি খামার এবং একটি রিসোর্টে শেয়ার থাকার কথাও উঠে এসেছে। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি প্রকৌশলীর বৈধ আয়ে এত বিপুল সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব হলো।
শুভ্র আহমেদ নিজেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং এই রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিল তার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা-বলয়। এই প্রভাবের কারণেই এতদিন কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায়নি বলে শোনা যায়।
এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একজন কর্মকর্তা কীভাবে টানা সাত বছর ধরে একই সংবেদনশীল নিয়োগ শাখায় দায়িত্বে থাকতে পারেন এবং পদোন্নতির সময় তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তার টেন্ডার কার্যক্রম ও সম্পদের বিষয়গুলো কীভাবে নজরদারির বাইরে থেকে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই বিষয়টি কেবল একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ নয় বরং রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্তের মাধ্যমেই কেবল এই আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব। অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং প্রয়োজনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

