মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের একমাত্র ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায়। আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, সবখানেই দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’ লেখা নোটিশ টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। যেসব স্টেশনে সীমিত আকারে গ্যাস সরবরাহ রয়েছে, সেখানে চাপ এতটাই কম যে, একটি গাড়িতে গ্যাস নিতে স্বাভাবিক সময়ের কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। এতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে শত শত সিএনজি অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের।মিরপুর রোডের একটি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকা সিএনজি চালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল ৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন পর্যন্ত গ্যাস পাইনি। গাড়ি রাস্তায় নামাতে না পারলে মালিকের জমা দেব কীভাবে, সংসারই বা চলবে কীভাবে?সিএনজিচালক আব্দুল কাদের বলেন, গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতেই দিনের অর্ধেক শেষ হয়ে যাচ্ছে। যাত্রী তুলতে পারছি না। আয় না হলে পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে যাবে।একই স্টেশনে থাকা একটি বাসের হেল্পার মো. সোহেল মিয়া বলেন, প্রতিদিন ভোরে গাড়ি নিয়ে বের হই। কিন্তু এখন গ্যাস না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে। কাজ না থাকলে আমাদের দৈনিক আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।ব্যক্তিগত গাড়ির চালক মো. জাহিদ হাসান বলেন, অফিসের কাজে বের হতে গিয়ে বিপাকে পড়েছি। কয়েকটি পাম্প ঘুরেও গ্যাস পাইনি। যেখানে গ্যাস আছে, সেখানে এত বড় লাইন যে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
শুধু পরিবহন খাতই নয়, আবাসিক এলাকাতেও গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, সকালে বাচ্চাদের জন্য নাশতা বানাতে পারিনি। দুপুরেও গ্যাস ছিল না। রান্না করতে না পেরে বাইরে থেকে খাবার আনতে হয়েছে।
আদাবরের গৃহিণী শারমিন সুলতানা বলেন, দুই দিন ধরেই গ্যাসের চাপ খুব কম। আজ তো একেবারেই ছিল না। ছোট সন্তান নিয়ে খুব ভোগান্তিতে আছি।
মিরপুরের বাসিন্দা রুবিনা ইয়াসমিন বলেন, গ্যাস কখন আসে, কখন যায়, তার কোনো ঠিক নেই। রাতে রান্না করতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা স্বাভাবিকভাবে সেবা দিতে পারছেন না। অনেক স্টেশনে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম গ্যাস পৌঁছাচ্ছে।
এ বিষয়ে বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের গ্রাহককে গ্যাসের স্বল্পচাপ বা সরবরাহ সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
যদিও গতকাল মঙ্গলবার গ্যাস সরবরাহ নিয়ে সুখবর দিয়েছে মন্ত্রণালয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, এলএনজির ভাসমান টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির মেরামতের কাজ চলছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে সমাধান হবে। সিএনজি স্টেশনে সংকট খুবই সাময়িক, এটিও থাকবে না।
তিনি বলেন, দেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে প্রতিদিন সরবরাহ করা যায় ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেদিক থেকে কিছুটা ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে আছে। একটি এফএসআরইউতে (এলএনজির ভাসমান টার্মিনাল) যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এর ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। যে কারণে সিএনজি স্টেশনগুলোতে কিছুটা লাইন দেখা গেছে।
যুগ্মসচিব আরও বলেন, গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে অনেক দিন কাজ হয়নি। নতুন সরকার আসার পর থেকে এ কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার এবং আগস্টে ২ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল আসবে। সব মিলিয়ে জ্বালানি পণ্যের কোনো ধরনের সংকট নেই। সংকট তৈরির চেষ্টা থেকে গুজব তৈরি করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুধু ক্রুড অয়েল আসে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর রেড সি দিয়ে আমদানি করা হচ্ছে। রেড সি বন্ধ হলে সে ক্ষেত্রে বিকল্প রুটও ভাবছে বাংলাদেশ।

