বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট এখন শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ নয়, দর্শক ফিরিয়ে আনা। একসময় শুক্রবার মানেই ছিল নতুন সিনেমা দেখার উৎসব। পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার সংস্কৃতি ছিল দেশের বিনোদনজগতের অন্যতম অনুষঙ্গ। অথচ এখন বড় বাজেটের বা আলোচিত কয়েকটি সিনেমা ছাড়া বেশিরভাগ সিনেমাই প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—দর্শক কি সিনেমা ছেড়ে দিয়েছেন, নাকি চলচ্চিত্রই দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না?চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, শক্তিশালী গল্প ও চিত্রনাট্যের অভাব। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন একজন দর্শক ঘরে বসেই বিশ্বের সেরা সিনেমা ও সিরিজ দেখতে পারেন। ফলে তার রুচি ও প্রত্যাশা আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। একই ধরনের গল্প, দুর্বল সংলাপ কিংবা গতানুগতিক নির্মাণ সহজেই দর্শকের কাছে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে।দেশের প্রেক্ষাগৃহ সংকটকেও অনেকেই দর্শক খরার কারণ হিসেবে জানিয়েছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে একসময় এক হাজারের বেশি সিনেমা হল ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও দর্শক কমে যাওয়ার কারণে অধিকাংশ হল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স গড়ে উঠলেও সেগুলো মূলত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কয়েকটি বড় শহরেই সীমাবদ্ধ। ফলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য বড় পর্দায় সিনেমা দেখার সুযোগ এখনো সীমিত।
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, শুধু হলের সংখ্যা নয়, দর্শকের সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রেক্ষাগৃহে এখনো আরামদায়ক আসন, উন্নত সাউন্ড কিংবা পরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভাব রয়েছে। ফলে পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার আগ্রহ কমে যায়।চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ভালো সিনেমা নির্মাণ করলেই হবে না, দর্শকদের জন্য নিরাপদ ও পরিবারবান্ধব প্রেক্ষাগৃহ নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি। একসময় সিনেমা হল ছিল বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় পারিবারিক বিনোদনের মাধ্যম। নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই পরিবার-পরিজন নিয়ে হলে যাওয়ার সংস্কৃতি ছিল বেশ স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অনেক সিনেমা হলের অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অস্বস্তিকর আসন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের অভাব, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকা এবং শৃঙ্খলার ঘাটতির কারণে অনেক দর্শক, বিশেষ করে পরিবার ও নারী দর্শক, প্রেক্ষাগৃহে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
এমন অভিযোগ উঠে আসে দর্শকদের কথায়ও। দর্শকদের অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশগত সমস্যা। ধূমপান নিষিদ্ধ থাকলেও অনেক হলে প্রকাশ্যেই ধূমপান করা হয়। কোথাও কোথাও অসামাজিক আচরণ, উচ্চস্বরে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি, অশালীন মন্তব্য এবং নারী দর্শকদের প্রতি হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে অনেকেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। পাশাপাশি মোবাইল ফোনে সিনেমার দৃশ্য ধারণ বা ভিডিও রেকর্ড করার প্রবণতা কেবল কপিরাইট লঙ্ঘনই নয়, অন্যান্য দর্শকের সিনেমা উপভোগের অভিজ্ঞতাকেও ব্যাহত করে।
এর বাইরেও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম দর্শকের বিনোদনের ধরন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। মাসিক স্বল্প খরচে আন্তর্জাতিক মানের কনটেন্ট যখন হাতের মুঠোয়, তখন দর্শক কেবল সেই সিনেমাই হলে দেখতে চান, যা বড় পর্দায় ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। অর্থাৎ সিনেমাকে এখন ওটিটির সঙ্গে নয়, অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় বৈষম্য। অনেক নির্মাতা অভিযোগ করেন, ভালো সিনেমা তৈরি হলেও পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছায় না। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর প্রচারণা এখন সিনেমার সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কেবল ট্রেলার প্রকাশ করলেই হচ্ছে না; দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংযোগ তৈরির কৌশলও প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সংকটের কারণ খুঁজতে উঠে আসে আরও ভিন্ন দিক। চলচ্চিত্রভিত্তিক বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ ও দর্শকদের মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলা চলচ্চিত্রের নিয়মিত দর্শকদের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী তরুণ। ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য উৎসব কেন্দ্র করে পরিবার ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত দর্শকদের উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও বছরের বাকি সময়ে সে সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে উৎসবের বাইরে অধিকাংশ সিনেমাই প্রত্যাশিত দর্শক পায় না।।
তবে আশার দিকও রয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে কয়েকটি দেশীয় সিনেমা দর্শকদের আবার প্রেক্ষাগৃহমুখী করেছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, দর্শক হারিয়ে যাননি; বরং তারা ভালো সিনেমার অপেক্ষায় আছেন। শক্তিশালী গল্প, মানসম্মত নির্মাণ, দক্ষ অভিনয় এবং পরিকল্পিত বিপণন একসঙ্গে মিললে দর্শক এখনো টিকিট কেটে সিনেমা দেখতে আগ্রহী।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দর্শক ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন ও মানসম্মত সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ধূমপান ও মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে কঠোরভাবে তা বাস্তবায়ন, নারী ও পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অসামাজিক আচরণের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া, মোবাইলে ভিডিও ধারণ বন্ধে কার্যকর নজরদারি, আধুনিক ও আরামদায়ক আসন স্থাপন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং টিকিটের মূল্য যৌক্তিক ও স্বচ্ছ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু ভালো সিনেমার ওপর নির্ভর করছে না; বরং দর্শক যেন স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সিনেমা উপভোগ করতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও আধুনিক প্রেক্ষাগৃহই পারে পরিবারকে আবার সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনতে। চলচ্চিত্রের মানোন্নয়নের পাশাপাশি যদি প্রেক্ষাগৃহ ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তবে দেশের সিনেমা শিল্প আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ও দর্শকপ্রিয়তা ফিরে পেতে পারে। চলচ্চিত্রে দর্শক খরার এ বাস্তবতা আসলে শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ দর্শক কখনোই বিনোদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন না; তারা শুধু ভালো কনটেন্টের অপেক্ষায় থাকেন। সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলে আবারও প্রেক্ষাগৃহে ফিরবে দর্শকের কোলাহল।

