দেশজুড়ে জুনের শুরুতেই তীব্র গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবারও (৩ জুন) দেশের ৪৮ জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে।চলতি বছরে একসঙ্গে এত জেলায় তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এটিই প্রথম। সাধারণত মে মাসের শেষ দিকে দেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ ঘটে। কিন্তু এবার বর্ষা আসতে দেরি হওয়ায় গরমের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ২ জুনের তাপপ্রবাহ মানচিত্রে দেশের অধিকাংশ জেলা হলুদ ও কমলা রঙে চিহ্নিত রয়েছে। এর অর্থ হলো দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৩৬ থেকে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বিরাজ করছে।
বিশেষ করে রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় মাঝারি তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকাও তাপপ্রবাহের আওতায় রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের গরমের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মৌসুমি বায়ুর দেরিতে প্রবেশ। সাধারণত বর্ষা শুরু হলে মেঘ ও বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কমে আসে। কিন্তু এখনো মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারায় সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করছে।এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ এবং বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পও অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় ঢাকার আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৮৬ শতাংশ। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারছে না। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় গরমের অনুভূতি আরও বেশি হচ্ছে।
বৈশ্বিক আবহাওয়াগত প্রভাবও এবারের তাপপ্রবাহের পেছনে ভূমিকা রাখছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দ্রুত বাড়ছে।
এল নিনোর কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগরাঞ্চলের ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপ প্রভাব। বিশেষ করে ঢাকা শহরে কংক্রিটের স্থাপনা, পিচঢালা রাস্তা, সবুজায়নের ঘাটতি এবং যানবাহন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে নির্গত তাপ শহরের তাপমাত্রাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে রাতেও তেমন স্বস্তি মিলছে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু টেকনাফ উপকূল পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারে। শুক্রবার থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়বে। রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক স্থানে বজ্রসহ বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। তবে শুক্রবার থেকে তাপপ্রবাহের বিস্তৃতি কমতে শুরু করতে পারে।
অন্যদিকে আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের মতে, মৌসুমি বায়ু প্রবেশে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে। এবার বেশ দেরি হচ্ছে এ বায়ু প্রবেশে। এরপর ধীরে ধীরে দেশজুড়ে বৃষ্টিপাত বাড়বে।
তবে বৃষ্টি শুরু হলেও সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তি ফিরবে না। কারণ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় গরমের অনুভূতি আরও কয়েক দিন বজায় থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী পাঁচ দিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়বে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে আবহাওয়ার বর্তমান চিত্র বলছে, দেশের এই অস্বস্তিকর গরম আরও অন্তত দুই থেকে তিন দিন স্থায়ী হতে পারে। তবে সপ্তাহের শেষে বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপপ্রবাহের তীব্রতা কমতে শুরু করবে। মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি সক্রিয় হলে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে গরম থেকে স্বস্তি ফিরতে পারে।

