রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুই দিনের সফরে চীনে পৌঁছেছেন। সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক ক্রমেই আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।
পুতিনের সফরের মাত্র একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিং সফর শেষ করেছেন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের তিন প্রভাবশালী নেতার কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন ভূরাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত ‘গুড-নেইবারলিনেস অ্যান্ড ফ্রেন্ডলি কো-অপারেশন’ চুক্তির ২৫ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটেও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও সীমান্ত উত্তেজনার পর ওই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন ভিত্তি পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা হয়ে পড়া রাশিয়া এখন অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জন্য অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।বিশেষ করে চীনা প্রযুক্তি ও শিল্পপণ্যের ওপর রাশিয়ার নির্ভরতা বেড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বহু প্রযুক্তিপণ্য এখন চীন থেকেই সংগ্রহ করছে রাশিয়া। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির বড় ক্রেতায় পরিণত হয়েছে চীন।
অন্যদিকে চীনের জন্যও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বেইজিং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতিতে স্থলপথে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস সরবরাহকে আরও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে দেখছে চীন।
এ কারণে বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকা ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প আবার গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিবছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার রুশ গ্যাস মঙ্গোলিয়ার মাধ্যমে চীনে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি কৌশলগত দিক থেকেও দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে প্রায়ই একসঙ্গে অবস্থান নেয় মস্কো ও বেইজিং।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের যৌথ সামরিক মহড়াও বেড়েছে। বিশেষ করে ‘জয়েন্ট সি’ নামে নৌ-মহড়া এবং জাপান সাগরে পরিচালিত সামরিক অনুশীলনকে দুই দেশের কৌশলগত সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-চীন সম্পর্কের মূল শক্তি হচ্ছে পারস্পরিক স্বার্থ। পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধিতার বাইরেও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রয়োজনই দুই দেশকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

