নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও লাভজনক সরকারি স্থাপনা বিদেশি কোম্পানির কাছে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী ও অদূরদর্শী বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেছেন, জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিজেদের সক্ষমতায় করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বেলা ১১টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ঢাকা মহানগর কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত বিক্ষোভপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বন্দর লিজের সিদ্ধান্ত বাতিল, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মব সন্ত্রাস প্রতিরোধ এবং দখলদারিত্ব বন্ধের দাবিতে এ সমাবেশ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
সাইফুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, লালদিয়া ও পানগাঁও বন্দরসহ লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা বিদেশি কোম্পানির হাতে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে সরকার যে বিনিয়োগ ও আর্থিক লাভের হিসাব দিচ্ছে, তা তথ্যভিত্তিক নয় বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, বন্দরের ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত ও গতিশীল করার সুযোগ রয়েছে। তবে সে জন্য জাতীয় সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়াই একমাত্র পথ নয়। নিজেদের ব্যবস্থাপনায়ও বন্দর পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মাথাব্যথার জন্য আমরা মাথা কেটে ফেলতে পারি না।”
তিনি আরও বলেন, ৫৪ বছরেও যদি একটি রাষ্ট্র তার প্রধান বন্দর পরিচালনায় স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে দেশ বা সরকার কীভাবে চলবে? লোকসান ও ভর্তুকির যুক্তিতে দেশের জ্বালানি খাতও কি বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারকে জনগণের স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাইফুল হক বলেন, বাজার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও দুর্বৃত্তদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিও জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপরাধী ও দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না। জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে মানুষ যৌক্তিক সময় দেবে, তবে সেই সময় অনির্দিষ্ট হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রসঙ্গ তুলে সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দ্রুত যাওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান সাইফুল হক।
সমাবেশে পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো লাভজনক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা, চাঁদাবাজি, জবরদখল, সন্ত্রাস ও মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য আকবর খান বলেন, দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব উপেক্ষা করে বন্দর ও কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ কোনোভাবেই সফল হতে দেওয়া হবে না। জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি।
পার্টির ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি মীর মোফাজ্জল হোসেন মোশতাকের সভাপতিত্বে এবং মীর রেজাউল আলমের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাশিদা আক্তার, সাইফুর রেজা মামুন, সাইফুল ইসলাম ও বিপ্লবী রিকশা শ্রমিক সংহতির সভাপতি জামাল সিকদার।
এ সময় পার্টির মহানগর কমিটির নেতা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, জামিলুর রহমান ডালিম, ঢাকা মহানগর বিপ্লবী যুব সংহতির আহ্বায়ক তুহিন রহমান, সদস্যসচিব মো. ইব্রাহিম হোসেন রনি, নারী নেত্রী মরিয়ম আক্তার ও নার্গিস আক্তার লিমাসহ অন্যান্য নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সেগুনবাগিচায় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

