কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।আহত হয়েছেন আরো অন্তত ৩৯ জন। এসব জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ।
আবহাওয়া অফিসের ভারি বর্ষণ নিয়ে দেওয়া সতর্কবার্তায় বলে হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে আজ রবিবার (১২ জুলাই) দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি (৪৪-৮৮ মি.মি. /২৪ ঘণ্টা) থেকে অতি ভারি (৮৮ মি.মি. /২৪ ঘণ্টা) বর্ষণ হতে পারে।টানা বৃষ্টিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়ক ডুবে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার বিদ্যালয়-কলেজ বন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষেরা। ভারি বৃষ্টিতে তারা কাজের সন্ধানে বের হতে পারছেন না।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মৃতদের মধ্যে চট্টগ্রামে ১১ জন, কক্সবাজারে ২৩ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং বান্দরবানে ৬ জন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে চট্টগ্রামে ১২ জন, কক্সবাজারে ২৪ জন, খাগড়াছড়িতে ১ জন এবং বান্দরবানে ২ জন।
দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। যেখানে ৬ লাখ ৬২ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৮২০, খাগড়াছড়িতে ৩৪ হাজার ৪১৭ এবং বান্দরবানে ৮ হাজার ৩৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।এ পাঁচ জেলায় এক হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫৫ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। চট্টগ্রামে ৬৭০টি, কক্সবাজারে ৬৪০টি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় ৪৭টি, খাগড়াছড়িতে ১৫০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে চট্টগ্রামে ২২ হাজার ৬০০ জন, কক্সবাজারে ২ হাজার ৯৭৪ জন, রাঙ্গামাটিতে ৩ হাজার ৮২০ জন, খাগড়াছড়িতে ২ হাজার ৯১৬ জন এবং বান্দরবানে ৪ হাজার ৭৪৫ জন রয়েছেন।
এখন পর্যন্ত এক হাজার ৯১ দশমিক ৬ মেট্রিক টন চাল, ৯১ দশমিক ১ লাখ টাকা এবং ৩৪ হাজার ৪৭০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় রান্না করা খাবার, শিশু খাদ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিনও বিতরণ করা হয়েছে।
বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রামে ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর আউশ ধান, ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমন, ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টরের বেশি গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারে ২ হাজার ৬২০ হেক্টর আউশ ধান, ৪৭০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৯৫৫ হেক্টর সবজি এবং ১৫৬ হেক্টর পান বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাঙামাটিতে ৭১৭ হেক্টর আউশ ধান, আমন বীজতলা ১৫৮ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি ৯৮৭ ও আদা ৭৪৩ হেক্টর সবজি, হলুদ ৬৪৮ হেক্টর জমি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও আউশ ধান, আমন বীজতলা এবং সবজি চাষে বড় ধরনের ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
অতিভারি বৃষ্টিতে দেশের ১২ জেলার বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে। প্লাবিত হতে পারে নতুন নতুন এলাকা। রবিবার (১২ জুলাই) পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এমন পূর্বাভাস দিয়েছে।
পাউবো জানিয়েছে, সাঙ্গু নদী বান্দরবান (বান্দরবান) ও দোহাজারী (চট্টগ্রাম), কুশিয়ারা নদী মারকুলি (সুনামগঞ্জ) ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট), সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।এদিকে আগামী দুদিনে ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম; জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব অথবা কিছুটা অবনতি হতে পারে।
অন্যদিকে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
রবিবার (১২ জুলাই) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহানের সই করা বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পরিস্থিতি এবং পূর্বাভাস এসব তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়, সাঙ্গু নদীর বান্দরবান ও দোহাজারী, কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও ফেঞ্চুগঞ্জ এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার উপরে রয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুদিনে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির মুহুরী, ফেনী নদী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। এ সময় লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

