তুরস্কের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ের পর নতুন করে সামনে এসেছে শরণার্থী শিবির থেকে এসে বিশ্বকাপে খেলা অস্ট্রেলিয়ার দুই তরুণের গল্প। অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলের সেই বিখ্যাত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ বা সোনালী প্রজন্ম নিজেদের নাম ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ঠিক ২০ বছর পর, ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে সকারুজদের প্রচারণার প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন দুই আফ্রিকান শরণার্থী।২০ বছর বয়সী নেস্টোরি ইরানকুন্ডা এবং ২২ বছর বয়সী মোহামেদ তুরে এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দুই উদীয়মান প্রতিভা। তুরস্কের বিপক্ষে অজিদের ঐতিহাসিক ২-০ গোলের জয়ের প্রথম গোলটি এসেছে নেস্টোরি ইরানকুন্ডার পা থেকে।
এই দুই তরুণের মধ্যে মিল রয়েছে অনেক জায়গায়। দুজনেই আফ্রিকা থেকে শরণার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন।ইরানকুন্ডা তানজানিয়া থেকে আর তুরে গিনি থেকে। দুজনেই অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের যুব একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন এবং এই মুহূর্তে দুজনেই খেলছেন ইংল্যান্ডের ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়নশিপে।
এমন এক সময়ে তারা বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন, যখন বিশ্বজুড়ে অভিবাসী-বিরোধী স্লোগান ও রাজনীতি তীব্র হচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ২৬ সদস্যের এই স্কোয়াডটি এসেছে অন্তত ১৫টি ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পটভূমি থেকে।মাঠের এই দলটি আসলে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক অস্ট্রেলিয়ারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন মানুষের জন্ম দেশের বাইরে।
নিজের অদম্য শারীরিক শক্তি এবং বিদ্যুতগতির জন্য পরিচিত মোহামেদ তুরে এবার খেলছেন অস্ট্রেলিয়ার মূল স্ট্রাইকার বা ‘লিড ফরোয়ার্ড’ হিসেবে। ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব নরউইচ সিটির হয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে মাত্র ১১ ম্যাচে ৯ গোল করে এক অবিশ্বাস্য ব্রেক-আউট সিজন কাটিয়েছেন তিনি।
তুরের জন্ম হয়েছিল গিনির রাজধানী কোনাক্রির একটি শরণার্থী শিবিরে। লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তার বাবা-মা দীর্ঘ ১৪ বছর সেই শিবিরে কাটিয়েছিলেন।তুরের বয়স যখন মাত্র সাত মাস, তখন তারা শরণার্থী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে।
তুরে এবং ইরানকুন্ডা দুজনেই তাদের আরেক সতীর্থ আওয়্যার মাবিলের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ‘গেমচেঞ্জিং টিম’-এর সদস্য। এটি মূলত বাস্তুচ্যুত বা শরণার্থী ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা ফুটবলারদের নিয়ে গড়া এক প্রতীকী বিশ্ব একাদশ। মাবিল নিজেও কেনিয়ার এক শরণার্থী শিবিরে দক্ষিণ সুদান থেকে আসা দম্পতির ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের হয়ে খেলেছেন।
তুরের কাছে সকারুজদের এই সবুজ-হলুদ জার্সিটা গায়ে জড়ানো মানে এক পরম ‘স্বাধীনতা’।
তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া এমন এক দেশ যা আমাদের সুযোগ দিয়েছে, আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন শরণার্থী হিসেবে আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে আমার ক্যারিয়ারের গ্রাফ আমাকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাবে কিংবা আমি নরউইচ সিটির হয়ে খেলব।’
ইরানকুন্ডার কাছে এটা এখনও এক অবিশ্বাস্য ঘোর যে, অস্ট্রেলিয়ার মতো একটা দেশে তাদের মতো কৃষ্ণাঙ্গ তরুণরা আজ ফুটবলের প্রধান মুখ বা পোস্টার বয় হয়ে উঠছে। অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, “এটা ভাবলেই পাগলামি মনে হয়, কারণ কে এটা কখনো ভেবেছিল? এখন যখন এটা সত্যিই ঘটছে। সবাই অবাক হয়ে বলছে, ‘ওয়াও’। আমি নিজেও কখনো ভাবিনি এটা সম্ভব হবে, হয়তো কোনো একদিন হতো, কিন্তু এত দ্রুত হবে তা ভাবিনি।”নিজের হিরোকে নিয়ে ইরানকুন্ডা বলেন, ‘আমার বড় হওয়ার দিনগুলোতে আমি যার দিকে তাকিয়ে অনুপ্রেরণা খুঁজতাম, মানুষ তাকে কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে গণ্য করে কি না আমি জানি না, তবে আমি বলব টিম কাহিল। তিনি সামোয়ান ব্যাকগ্রাউন্ডের (আধা-কৃষ্ণাঙ্গ) ছিলেন, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি তাকে আইডল মানতাম, বিশেষ করে তার খেলার ধরণ। আজ পর্যন্ত ওনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, তবে ওনার সাথে দেখা করা এবং একটা দীর্ঘ আড্ডা দেওয়া আমার জীবনের অন্যতম বড় একটা স্বপ্ন। কী অসাধারণ একজন খেলোয়াড় ছিলেন তিনি, এককথায় টপ প্লেয়ার!’
ইরানকুন্ডার জন্ম হয়েছিল তানজানিয়ার এক শরণার্থী শিবিরে, তার বাবা-মা ছিলেন বুরুন্ডির নাগরিক। পরে একদম শিশু বয়সে তারা অস্ট্রেলিয়ায় এসে স্থায়ী হন।
এই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া দলে আফ্রিকান ঐতিহ্যের অধিকারী মোট ছয়জন সকারুজ রয়েছেন। তুরে (গিনি ও লাইবেরিয়া) ও ইরানকুন্ডা (তানজানিয়া ও বুরুন্ডি) ছাড়াও দলে আছেন লুকাস হ্যারিংটন (জিম্বাবুয়ে), জেসন গেরিয়া (উগান্ডা), এবং আওয়্যার মাবিল ও তেতে ইয়েনগি (দুজনেই দক্ষিণ সুদান)।
ইরানকুন্ডা বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেন, ‘আফ্রিকান ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা আমরা সবাই যে আজ এখানে একসাথে জাতীয় দলে খেলছি, এটা ভাবতেই দারুণ লাগে। এটা আমাদের পুরো আফ্রিকান কমিউনিটির জন্যই এক বিশাল গর্বের ব্যাপার।’

