নিজস্ব প্রতিবেদক :
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্তে এর সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোংলা কাস্টমস, ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেট এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে পুঁজি করে শুল্ক স্টেশন ও ব্যবসায়ী মহলে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছিলেন, যা তাকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বিচারিক রায় বা সরকারি তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি, তবুও তার কর্মকাল এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরের কর্মপরিধি বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারি চাকরির স্বল্প সময়ে তিনি যেভাবে প্রভাবশালী অবস্থানের সুবিধা নিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত সম্পদের যে ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে তা তার সরকারি বেতন ও বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকার অভিজাত এলাকায় প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট কেনা, বরগুনায় নিজ জেলায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ এবং তার স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ ও বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারের যে তথ্য উঠে এসেছে, তা জনমনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে তিনি এই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তবে অভিযোগকারীদের উপস্থাপিত এসব তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোনো প্রকৌশল মূল্যায়ন, জমির রেকর্ড বা ব্যাংক হিসাবের নথিপত্র জনসমক্ষে আসেনি। একজন সরকারি কর্মকর্তার জীবনযাত্রার মান এবং তার দৃশ্যমান সম্পদের এই বিশাল ব্যবধানই মূলত দুর্নীতি দমন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।এই ধরণের গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক ভূমিকা এবং জবাবদিহি এখন বড় আলোচনার বিষয়। অভিযোগ রয়েছে যে, সরোয়ার হোসেন তার পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করতে এবং বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তবে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কেবল গণমাধ্যম বা অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে চূড়ান্ত বলে গণ্য করা যায় না। দুর্নীতি দমন কমিশন বা এনবিআর কর্তৃপক্ষ যদি এই বিষয়গুলো আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় আনে, তবেই কেবল তার আয়কর নথি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত নথিপত্রের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। পাশাপাশি, অভিযুক্ত কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার বজায় রেখে আইনি প্রক্রিয়ায় পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার দাবিও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখতে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।পরিশেষে, মো. সরোয়ার হোসেনকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ অর্জনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি বৃহত্তর কাঠামোগত প্রশ্ন। যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হয়, তবে সেটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সুনাম ক্ষুণ্ণ না হয়; আবার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি কোষাগারে রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। তাই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমেই কেবল এই পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত সততা বজায় রাখতে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।

