গরমের দিনে একটু স্বস্তির জন্য অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটান শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে। অফিস, বাসা, গাড়ি—প্রায় সব জায়গাতেই এখন এয়ার কন্ডিশন যেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তীব্র তাপদাহে এসি যেমন আরাম দেয়, তেমনি এর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার শরীরের ওপর ফেলতে পারে নানা প্রভাব। কখনো তা উপকারী, আবার কখনো ক্ষতিকরও হতে পারে।ওয়েবমেড এর প্রতিবেদনে এয়ারকন্ডিশন রুমের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
শরীর শুষ্ক ও পানিশূন্য করে
এয়ার কন্ডিশনার ঘরের আর্দ্রতা কমিয়ে বাতাস ঠাণ্ডা করে। এতে ত্বক ও শরীর থেকে আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। ফলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে এবং ত্বক শুষ্ক লাগে।
শ্বাসনালিতে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনে কাজ করেন, তাদের মধ্যে নাকের ভেতরে জ্বালা, শ্বাসকষ্টসহ শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায়। প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলযুক্ত স্থানে এসব সমস্যা তুলনামূলক কম।
অ্যালার্জির সমস্যা বাড়াতে পারে
এসি পরিষ্কার থাকলে এটি অ্যালার্জি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে অপরিষ্কার এইচভিএসি সিস্টেমে জীবাণু ও অ্যালার্জেন জমে যেতে পারে।
তাই নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
মাথাব্যথার কারণ হতে পারে
যদি এসির ফিল্টার নোংরা থাকে বা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা হয়, তাহলে মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর ঘরের বাতাসে কাজ করা ৮ শতাংশ মানুষের মাসে ১-৩ দিন মাথাব্যথা হয় এবং আরও ৮ শতাংশের প্রতিদিনই মাথাব্যথা হয়।
চোখ শুকিয়ে যায়
এসি কক্ষে আর্দ্রতা কম থাকায় চোখ শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। এতে চোখে জ্বালা, চুলকানি এমনকি দৃষ্টিও ঝাপসা হতে পারে।
ঘরের বাতাসে লুকিয়ে থাকতে পারে জীবাণু
যদি আপনি এমন কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনে কাজ করেন যেখানে বায়ু চলাচল কম, তাহলে “সিক বিল্ডিং সিনড্রোম”-এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথাব্যথা, শুকনো কাশি, মাথা ঘোরা, বমিভাব, মনোযোগে সমস্যা, ক্লান্তি এবং গন্ধের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা। এছাড়া কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত ঘরের বাতাস সামান্য হলেও নানাবিধ সংক্রমণ রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমায়
বিজ্ঞানীরা একে ‘অ্যাডাপটিভ কমফোর্ট মডেল’ বলেন। অর্থাৎ দীর্ঘসময় এসিতে থাকলে শরীর গরম আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা হারাতে থাকে। ফলে গরম ও আর্দ্র পরিবেশ আরও অস্বস্তিকর মনে হয়।
বাইরের পরিবেশ দূষিত করে
পুরোনো এসি ইউনিট থেকে সিএফসি (ক্লোরোফ্লুরোকার্বন) নামের গ্যাস বের হতে পারে, যা ওজোন স্তরের ক্ষতি করে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ায়। যদিও অনেক দেশে এসব কুল্যান্ট ধীরে ধীরে বন্ধ করা হয়েছে, তবু এখনো বিশ্বের অনেক স্থানে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভালো ঘুমে সহায়তা করে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০-৬৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার ঘর ভালো ঘুমের জন্য আদর্শ। কারণ ঘুমের সময় শরীর স্বাভাবিকভাবেই ঠাণ্ডা হতে থাকে, আর ঠাণ্ডা ঘর সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।
ওজন কমাতে সহায়তা করে
গবেষণায় দেখা গেছে, ঠাণ্ডা পরিবেশে বেশি সময় থাকলে ওজন কমাতে সহায়তা হতে পারে। কারণ শরীর ঠাণ্ডার সঙ্গে মানিয়ে নিতে “ব্রাউন ফ্যাট” নামের শক্তি পোড়ানো স্বাস্থ্যকর চর্বি বাড়ায়। গরমের সময় এসি শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করলেও এ সুবিধা পুরোপুরি পেতে শীতকালেও তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় থাকতে হয়।
চিন্তাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে
২০১৮ সালের হার্ভার্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী গরমকালে এসিবিহীন ডরমিটরিতে থাকতেন, তারা জ্ঞানীয় পরীক্ষায় তুলনামূলক খারাপ ফল করেছেন। অন্যদিকে ঠাণ্ডা পরিবেশে থাকা শিক্ষার্থীরা ভালো পারফর্ম করেন।
হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়
এয়ার কন্ডিশনের কিছু নেতিবাচক প্রভাব থাকলেও তীব্র গরমে এটি জীবনরক্ষাকারী হতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে হিট এক্সহসশনের ঝুঁকি থাকে, যার লক্ষণ হলো বমিভাব, পেশিতে টান, মাথা ঘোরা ও দুর্বল লাগা। তাপমাত্রা আরও বাড়লে হিট স্ট্রোক হতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
পরিচর্চা
এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিবর্তন, জানালা খোলা রাখা এবং হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

