স্টাফ রিপোর্টার॥
পটুয়াখালীর সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়ন পরিষদে সাবেক সচিব কনা আক্তারের দায়িত্বকালীন সময়ে বহিরাগত ব্যক্তি লিটন আকনের বিরুদ্ধে সরকারি অনলাইন সেবা নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, প্রভাব খাটানো এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী না হয়েও দীর্ঘদিন ধরে তিনি সরকারি আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জন্ম নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে অনেক সময় সচিবের কক্ষ থেকেই লিটন আকনের কাছে পাঠানো হতো। জন্ম নিবন্ধন সংশোধন, নাম পরিবর্তন, তথ্য সংযোজন কিংবা ট্রেড লাইসেন্স করতে কয়েক হাজার থেকে ১০-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, এসব অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হতো।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরকার নিয়োগপ্রাপ্ত অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জহিরুল ইসলাম ও উদ্যোক্তা আলাউদ্দিন মিয়াকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। অথচ ইউনিয়ন পরিষদের অনলাইন কার্যক্রমের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল লিটন আকনের হাতে।
অভিযোগ আছে, সাবেক সচিব কনা আক্তারের বরাদ্দকৃত কক্ষেই নিয়মিত বসতেন লিটন আকন। এমনকি অনেক সময় তাকে সচিবের চেয়ার ব্যবহার করে অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালনা করতেও দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একজন বহিরাগত ব্যক্তি কীভাবে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে এতটা প্রভাব বিস্তার করেছেন, তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, কমলাপুর বাজারে ছোট একটি কম্পিউটারের দোকান পরিচালনা করলেও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অল্প সময়েই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন লিটন আকন। নিজ এলাকা কমলাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য ধরান্দীতে বাড়ি নির্মাণ, জমি ক্রয় এবং পার্শ্ববর্তী লোহালিয়া ইউনিয়নে শ্বশুরবাড়ি এলাকায় বাড়ি ও জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, তিনি প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের মোটরসাইকেলে চলাচল করেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন সাধারণ কম্পিউটার দোকান ব্যবসায়ী কীভাবে অল্প সময়ে এত সম্পদের মালিক হলেন। এলাকাবাসী জানান, লিটন আকনের বাবা দীর্ঘদিন ধরে কমলাপুরের পার্শ্ববর্তী আদাবাড়িয়ার হাজিরহাট বাজারে রিকশা ও সাইকেল মেরামতের ছোট একটি দোকান পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সেই পরিবারের সন্তান হয়েও লিটন আকনের হঠাৎ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
পারিবারিকভাবেও তার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, লিটন আকনের ভয়ে তার বাড়ির লোকজনও আতঙ্কে থাকতেন। সম্প্রতি তার চাচাতো ভাই ফিরুজ আকন ও বোন খাদিজাকে মারধর করে পৈত্রিক সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ফিরুজ আকন অভিযোগ দায়ের করেছেন বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের প্রভাব দেখিয়ে ওই পরিবারকে এলাকা ছাড়া করার হুমকিও দেওয়া হয়।
এছাড়াও সাবেক সচিব কনা আক্তারের দায়িত্বকালীন সময়ে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিসহ বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে লিটন আকনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চৌকিদার/গ্রাম পুলিশ হাবিবের বিরুদ্ধেও মানুষকে হয়রানি ও এসব কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, হাবিব ছিলেন লিটন আকনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
সম্প্রতি কনা আক্তারের বদলির পর নতুন সচিব সুকুমার দাস যোগদান করলেও থেমে নেই লিটন আকনের তৎপরতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি এখন নতুন সচিব ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ইউপি সদস্যকে প্রভাবিত করে পুনরায় সরকারি আইডি ও পাসওয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এতে ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য নিরাপত্তা ও সরকারি সেবার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে কনা আক্তারের বিদায় উপলক্ষে “রাকিবুল ইসলাম লিটন” নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে তার প্রশংসাসূচক পোস্ট দেওয়া হলে সেখানে কমলাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মন্তব্যে অনেকে দাবি করেন, “লিটনের হাত ধরেই টাকা যেত সচিব কনা আক্তারের পকেটে।” আবার কেউ কেউ লিখেছেন, “মানুষকে হয়রানি করে এখন আবার ভালো মানুষ সাজছেন।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে লিটন আকন ও সাবেক ইউপি সচিব কনা আক্তারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় কমলাপুর ইউনিয়নজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার, অনলাইন সেবার নামে অর্থ বাণিজ্য ও বহিরাগত প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

