মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন সময়কালে বাড়তি দামে জ্বালানি ও সার আমদানির জন্য অতিরিক্ত ৩০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে এসব খাতে ভর্তুকি দিতে লাগবে প্রায় ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাজেট সহায়তা হিসেবে ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চিঠির সঙ্গে পাঠানো অবস্থানপত্রে বলা হয়েছে, এই ঋণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, জ্বালানি ও খাদ্য আমদানি নিশ্চিত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরবেন এবং বাড়তি ঋণের বিষয়টি আলোচনা করবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ২৫০ শতাংশ, এলএনজির দাম ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেখানে গত বছর একই সময়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ৩০১ কোটি ডলার, সেখানে চলতি বছরে তা বেড়ে ৫৫৮ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এছাড়া ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সারে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা, যা বাজেট বরাদ্দের তুলনায় অনেক বেশি।বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সৃষ্ট সংকটের পুনরাবৃত্তি। তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল।
বর্তমানে আবারও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছিল, তবে নতুন করে আমদানি ব্যয় বাড়ায় তা আবার চাপের মুখে পড়েছে।
ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে ঋণ সহায়তার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এসব সংস্থা ঋণের বিপরীতে বিভিন্ন সংস্কার শর্ত দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশই বাজেট সহায়তা নিচ্ছে, তাই বাংলাদেশের উদ্যোগ অস্বাভাবিক নয়। তবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীরা ব্যাখ্যা চাইতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ না করলে এই সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

