যতটা বার্সেলোনার আপন ছিলেন ঠিক ততটাই যেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুতে আর্জেন্টিনার পর ছিলেন লিওনেল মেসি। ক্লাবের হয়ে একের পর এক ব্যক্তিগত ও দলীয় পুরস্কার জিতলেও পারছিলেন না আর্জেন্টিনার হয়ে।তাই নিজ দেশের মানুষের কাছে চক্ষুশূল ছিলেন তিনি। সেই দুঃখে-অভিমানে অবসরও নেন মেসি।
অবসর ভেঙে যখন ফিরলেন তখন যেন পুর্নজন্ম হয় মেসির। একের পর এক রেকর্ড গড়ে দলকে এনে দিচ্ছেন শিরোপা।সেই ধারাবাহিকতায় ২০২২ বিশ্বকাপ জিতে অমরত্বের স্বাদ নেন মেসি।
বিদায় বেলা মেসির ২১ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে চোখ বুলানো যাক—
২০০৫ : দুঃস্বপ্নের রাত
হাঙ্গেরির বিপক্ষে ২০০৫ সালে অভিষেক লিওনেল মেসির। কিন্তু ১৮ বছর বয়সে অভিষেক হওয়া প্লে মেকারের রাতটা হয় দুঃস্বপ্নের। পুসকাস অ্যারেনায় ৬৩ মিনিটে বদলি নামার ৪৪ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখেন তিনি।দুভার্গ্যক্রমে মেসির কনুই হাঙ্গেরির ভিলমোস ভাঙ্কজাকের মুখে লাগলে লাল কার্ডে মাঠ ছাড়েন মেসি।
২০০৬ : বিশ্বকাপে অভিষেক
আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় মেসির। সার্বিয়ার বিপক্ষে ৬-০ ব্যবধানের জয়ের ম্যাচে অভিষেক গোল করেন তিনি। দেশের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন মেসি।
২০০৮ : অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন
ক্যারিয়ারের প্রথম মেজর পুরস্কার জেতেন ২০০৮ অলিম্পিকে।নাইজেরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্বর্ণ পদক জয়ী দলের সদস্য হন মেসি।
২০১০-১১ : সঙ্গী হতাশা
২০০৯ সালে আইকনিক ১০ নম্বর জার্সি পাওয়ার পর থেকেই বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম তুলে ধরেন মেসি। তবে ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১১ কোপা আমেরিকা থেকে দুঃস্বপ্নের বিদায় হয় আর্জেন্টিনার। উভয় টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় তারা। দুই টুর্নামেন্টে কোনো গোল করতে পারেননি মেসি।
২০১৪-১৬ : শিরোপা হাতছাড়া, রেকর্ড ও অবসর
২৪ বছর বয়সে অধিনায়কত্বের বাহুবন্ধনী পান মেসি। তার অধীনে প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে আশা ভঙ্গ হয় তাদের। একই বছর চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালেও হার।
২০২৬ কোপা আমেরিকায় আবারও চিলির কাছে হারে আর্জেন্টিনা। তবে সেমিফাইনালে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন তিনি। টানা তিন ফাইনাল হারার পর দুঃখে-অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন ৮ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী।
২০১৮-২১ : ফেরা ও দায়মোচন
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অবসর ভেঙে ফেরেন মেসি। বিশ্বমঞ্চে খেলতে হলে শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে কোয়ালিফায়ারে জিততেই হতো আর্জেন্টিনাকে। হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেন তিনি। তবে ফিফার টুর্নামেন্টে শেষ ষোলোয় বিদায় নিতে হয়।
বিশ্বকাপ হতাশার কাটলেও দায়মোচন করেন মেসি। প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনার হয়ে ২০২১ কোপা আমেরিকার ট্রফি জিতে। তাতে ২৮ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা ফুরায়। একই টুর্নামেন্টে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও গড়েন তিনি।
২০২২-২৪ : আজন্ম স্বপ্ন পূরণ ও কোপায় রাজত্ব
অবশেষে ধরা দিল সোনার ট্রফি। ফ্রান্সকে হারিয়ে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। দলের ৩৬ বছরের অপেক্ষা ফুরানোর সঙ্গে মেসির আজন্ম স্বপ্ন পূরণ হয়। টুর্নামেন্টে ৭ গোল করে প্রথম ফুটবলার হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বল জেতেন তিনি। আর ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকায় চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।
২০২৬ : ‘মেসি যুগের’ অবসান
ট্রফি ধরের রাখার মিশনে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু করে আর্জেন্টিনা। দলকে ফাইনালেও তোলেন মেসি। তবে স্পেনের কাছে হেরে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২১ গোলের রেকর্ড গড়েছিলেন মেসি। পরে অবশ্য রেকর্ডটা নিজের করে নেন কিলিয়ান এমবাপ্পে (২২)।
বিশ্বকাপের শোক কাটিয়ে না উঠতেই ৮ আগস্ট বাবা হোর্হে মেসিকে হারান মেসি। ২৩ দিন পর জাতীয় দল থেকে অবসর নেন। তবে আর্জেন্টিনার চাওয়ায় আজ বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলে বুটজোড়া তুলে রাখলেন কিংবদন্তি।

