etcnews
ঢাকাWednesday , 1 July 2026
  1. অনিয়ম
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ইসলাম
  5. উন্নয়ন
  6. ক্যাম্পাস
  7. খেলা
  8. জাতীয়
  9. নির্বাচন
  10. প্রতিবাদ
  11. প্রযুক্তি
  12. বানিজ্য
  13. বিনোদন
  14. বিশ্ব
  15. রাজনীতি
box ad 6
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জুলাই থেকে ফেরা, তবে ঘরে ফেরা নয়!

etcnews
July 1, 2026 12:46 pm
Link Copied!

৭ জুলাই দিনটি ছিল রোববার। শাহবাগসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে কোটা সংস্কারের দাবিতে, বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি চলছিল! আমরা ছাত্রদলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী বসুন্ধরা আবাসিক গেট অভিমুখে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে সমবেত হই! মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করায় ভাটারা থানার পুলিশ এসে আমাদের উঠিয়ে দিতে চাইলে, প্রতিরোধ গড়ে তুলি! পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়! পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়! আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল কোটা সংস্কারের আন্দোলনটাকে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপান্তরিত করা।মধ্যরাতে লন্ডন থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ইঞ্জি. সফিকুল ইসলাম রিবলু ভাই ফোন করেন। বলেন, এই আন্দোলনের মাধ্যমেই খুনি হাসিনার পতন ঘটাতে হবে! তোমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে আন্দোলনটা কন্টিনিউ করো, এটাই তোমাদের মোক্ষম সুযোগ! আমি তোমাদের পাশে আছি, সবধরনের সহযোগিতা করব।

সফিকুল ইসলাম রিবলু কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি থাকাকালে, ২০১৩ সালের হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে বাম চোখ হারান!

সফিকুল ইসলাম রিবলু আন্দোলনের সময় অনেক আহতকে চিকিৎসার জন্য অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন!

সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যখন ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো রাজপথে নেমে আসে, তখন এই আন্দোলন দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে! তখন সরকার এই আন্দোলন দমাতে মরিয়া হয়ে ওঠে! পুলিশ, বিজিবি, RAB,সোয়াট দিয়ে নিরীহ নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালাতে থাকে, পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয় অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে! চিরচেনা পিচঢালা রাস্তা রক্তে লাল হয়ে যায়!

গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির সিনিয়র নেতাদের।

 

 

১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাইদ এবং চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামকে গুলি করে হত্যা করলে আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয়! সেদিনের পর আমি নিজেও মৃত্যুর ভয় হারিয়ে ফেলি! মনস্থির করি হয় বাঁচব নয় মরবো— এই খুনি হাসিনার পতন করবই করব!

 

 

সেদিন রাতে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ১ দফা দাবি ঘোষণা করেন! এই একদফা বাস্তবায়নে আমরা জীবন-মরণের সীমানা অতিক্রম করে ১৭ জুলাই বসুন্ধরা গেট অভিমুখে ছাত্রদলের নেতাকর্মী, সমর্থক সবাইকে নিয়ে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলি! পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়! সেদিন আমাদের অনেক সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হন! আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্র হয়ে উঠলে ছাত্র-জনতাকে প্রকাশ্যে গুলি করে গণহত্যা চালাতে থাকে এবং ১৮ জুলাই সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়! ২০ জুলাই থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে!

 

 

২১ জুলাই কারফিউর দ্বিতীয় দিন, চারদিকে এক নীরব আতংক বিরাজ করছিল! আমরা ছাত্রদলের নেতৃত্বে ৭০-৮০ জনের একটি টিম বসুন্ধরা গেটের দিকে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হতে থাকি! হঠাৎ করেই পুলিশ এসে অনবরত গুলি এবং টিয়ারগ্যাস ছুড়তে থাকে! টিয়ারগ্যাসের তীব্রতায় টিকতে না পেরে কিছুটা পিছু হটতে হয়!

আমাদের সঙ্গের সহযোদ্ধা, বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নেয়! কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়, টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ে! আমিও তখন টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হয়ে একটি গলিতে আশ্রয় নিই! আমার অবস্থান ছিল যমুনা ফিউচার পার্কের পকেট গেটের অপর পাশে!

নিরস্ত্র হলেও মনোবল হারাইনি! কিছুক্ষণ পরে এসে রাস্তায় জড়ো হওয়ামাত্রই আমাদের উদ্দেশ করে আবারও গুলি করতে থাকে, যা আশপাশের দোকানের শাটার এবং ওয়ালে লাগে! মহুর্মুহু গুলির তীব্রতা ও ভয়াবহতায় মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে রূপ নেয় পুরো এলাকা। তখন আমার মনে হয়েছিল আজকেই আমার জীবনের শেষদিন, তখন অনেকটা আতংকিত হয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটি ভিডিও রেকর্ড করি! বলি যে…

এই আন্দোলনে যদি আমার মৃত্যু হয়, আমার লাশটা আমার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েন।’ সেসময় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এল ব্লকের একটি বাসায় রাত্রিযাপন করতাম! নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ১০টার মধ্যে কয়েকজন করে প্রগতি সরণির মহাসড়কটি অবরোধ করে অবস্থান নিতাম! সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আমরা রাজপথ ছেড়ে দিতাম! ইন্টারনেট বন্ধ করে, কারফিউ জারি করে আন্দোলনের টুঁটি চেপে ধরেছিল তৎকালীন মাফিয়া সরকার।

সেনাবাহিনীর টহল এবং পুলিশের গুলির মুখে অনেকেই ভয়ে বের হতেন না! কিন্তু আমরা আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছি, কারফিউর মধ্যেও ঝটিকা মিছিল করেছি।

 

 

ওইদিনগুলো সহজ ছিল না। নির্মম গণহত্যা ও আন্দোলনের নগরীতে পরিণত হয়েছিল বসুন্ধরা গেট এলাকা। আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই আমাদের মাঝে নেই। তারা পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন।

 

 

তৎকালীন স্বৈরশাসক খুনি হাসিনাকে হঠানোই ছিল আমার, আমাদের একমাত্র স্বপ্ন। ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে, ২৩ জুলাই কোটা সংশোধন করে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করলে অনেক আন্দোলনকারী নিজেকে গুটিয়ে নেন!

তখন আন্দোলন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে! এরই মধ্যে ঝরে গেছে অনেক তাজা প্রাণ! মা হারিয়েছেন তার নাড়ি ছেড়া ধন।

 

 

কিন্তু আমরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রাজপথ ছেড়ে যাইনি! ২৬ জুলাই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয় নাহিদ,আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া, আবু বাকের মজুমদার গ্রেপ্তার হলে আন্দোলনের পূর্ণ নেতৃত্ব চলে আসে ছাত্রদলের কাঁধে!

 

 

তখন আমারা ছাত্রজনতাকে একত্রিত করে আন্দোলনকে আরও চাঙা করে তুলি! ২৭ জুলাই বসুন্ধরা গেইট অভিমুখে আমরা শক্ত অবস্থান নিই, দুপুর আনুমানিক ২ বাজে! হঠাৎ RAB এর একটি হেলিকপ্টার থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে! আমি তখন প্রগ্রতি স্বরণীর রোডের মাঝখানে! হেলিকপ্টার থেকে গুলি এবং টিয়ারগ্যাস দেখে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠি! মনে হচ্ছিল রাস্তাটা যেন বিশাল মাঠের মতো প্রশস্ত হয়ে গিয়েছে!

 

 

কোনোমতে দৌড়ে লন্ডন মার্কেটে ডোকার চেষ্টা করি! মানুষের তীব্র চাপে সিঁড়িতে পড়ে আমার কোমরে মারাত্মকভাবে আঘাত পাই। একই দিনে ব্যাংক এশিয়া মোড়ে পুলিশের আবার আক্রমণের শিকার হই! পুলিশ আমাকে বেধড়ক পেটায় এবং কোমরে একাধিক লাথি মারে যাঁর ফলে আমার কোমরের ৪ ও ৫ নাম্বার ডিক্স মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আমি দমে যাইনি, আমার উপলব্ধি হচ্ছিল যে আমার সহযোদ্ধারা জীবন দিচ্ছে সে জায়গা ত আমি এখনো বেঁচে আছি!

 

 

আহত হওয়ার পর ডা. শাহ আমান উল্লাহ (বর্তমানে ড্যাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক) আমাকে চিকিৎসা দেন। আমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হইনি! হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা যেন মৃত্যু যন্ত্রণাকেও হার মানায়! এর থেকে সাময়িক নিরাময়ে যেন ফিজিওথেরাপিই আমার শেষ সম্বল!

 

 

আমার পরিবার যখন জানতে পারে আমি আন্দোলনে যাচ্ছি এবং আহত হয়েছি তখন আমাকে বারণ করলেও আমি আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকি। সবশেষ ৫ আগস্ট সকালটা ছিল ভীষণ নাটকীয়! সকাল ১০টায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত গ্রামীণফোনের অফিসে সামনে এসে জড়ো হয়ে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হতে চাইলে ভাটারা থানার পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি করতে থাকে এবং টিয়ারগ্যাস ছুড়তে থাকে! টানা ২ ঘণ্টা গুলি চালাতে চালাতে আমাদের টপটেনের মোড় ছাড়িয়ে নিয়ে আসে! পুলিশের গুলি শেষ হওয়া মাত্রই আমরা পুলিশকে ধাওয়া দিলে পুলিশ পিছু হঠতে বাধ্য হয়! দুপুর ১২টায় আমরা বসুন্ধরা গেট অভিমুখে আসামাত্রই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সাঁজোয়া যানে করে আসে এবং আমরা সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে উঠে পড়ি, তাদের সাথে কোলাকুলি করি! একটা আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

 

আমরা বলি, গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, আমরা স্বাধীন হয়েছি। সেনাবাহিনী হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দেয়, আমরা আপনাদের সাথে আছি! আর একটি গুলিও আপনাদের দিকে ছোড়া হবে না! তারপর মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি খুনি হাসিনা পালিয়েছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে— প্রায় ২ হাজারের অধিক প্রাণ, ২০ হাজার আহতের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে!

 

 

সমন্বয়কদের সরকারের উপদেষ্টা লাগামহীন দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতায় জুলাইয়ের অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জুলাইয়ের স্পিরিটকে ধারণ এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠা করতে আমরা এখনো নীরব আন্দোলন করে যাচ্ছি। সরকারকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।

গণতন্ত্রের আপসহীন ধারাবাহিকতা এবং জুলাইয়ের অর্জনকে প্রতিষ্ঠিত করতে এখনো নীরব আন্দোলন করেই চলেছি। তাই জুলাইয়ের মৃত্যুপুরী থেকে বেঁচে ফিরলেও আর ঘরে ফেরা হয়নি।

এই সাইটে কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।