রঙিন ডানায় ভর করে প্রকৃতি ঘিরে উড়ে বেড়ানো চোখজুড়ানো প্রজাপতি স্রষ্টার অন্যতম সুন্দর সৃষ্টি। এদের মনোমুগ্ধকর রং, কারুকার্যময় নকশা ও কোমল ডানার উড়ান চিরকালই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে এবং সববয়সী মানুষকেই আকৃষ্ট করে আসছে।এছাড়াও বাগান, বন, ঝোপঝাড় কিংবা প্রকৃতি বেষ্টিত মাঠে প্রজাপতির উপস্থিতি প্রকৃতিতে যোগ করে প্রাণ ও সৌন্দর্যের মোহনীয় মাত্রা। তাই প্রজাপতি শুধু একটি পতঙ্গ নয়, প্রকৃতির রূপ-লাবণ্যের এক অনন্য প্রতীক। প্রকৃতির রঙিন এই অতিথি শুধু সৌন্দর্যেরই প্রতীক নয়, এরা জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।সম্প্রতি বর্ষার স্নিগ্ধ সকালে তেমনই চোখধাঁধানো সৌন্দর্যে প্রকৃতি মাতানো অনিন্দ্যসুন্দর কয়েকটি ডোরাকাটা বাঘ প্রজাপতি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রকৃতি ঘিরে উড়তে দেখা যায়। এদের উজ্জ্বল কমলা ও কালোর চমৎকার মিশ্রণ, সাদা রঙের উপস্থিতিতে এবং রাজসিক সৌন্দর্যে অনন্য রঙিন ডানায় প্রকৃতি যেন আরও মনোমুগ্ধকর রূপে সেজে উঠেছিল। এদের দোদুল্যমান নৃত্যে এবং এক উদ্ভিদ থেকে অন্য উদ্ভিদে, এক ফুল থেকে অন্য ফুলে উড়ে উড়ে বসা, প্রকৃতি ঘিরে ওড়াউড়ির দৃশ্যে এক অভাবনীয় সৌন্দর্যে মেতে উঠেছিল প্রকৃতি।
জানা গেছে, ডোরাকাটা বাঘ প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক নাম ড্যানাউস জেনুশিয়া জেনুশিয়া। এরা নিম্ফ্যালিডি পরিবারের ডানায়িনি উপগোত্রের সদস্য। এই প্রজাপতির ডানার পটভূমিতে কালো শিরার কারণেই বাঘের গায়ের ডোরার মতো দেখায়। এ কারণেই এর নাম হয়েছে ডোরাকাটা বাঘ। অনেকের কাছে এটি বাঘবল্লা বা ভারতীয় মানার্ক নামেও পরিচিত। বাংলাদেশসহ পুরো এশিয়া, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে এবং ক্যানারি দ্বীপে এদের দেখা মেলে।প্রসারিত অবস্থায় ডোরাকাটা বাঘ প্রজাপতির জানার বিস্তার সাধারণত ৭২ থেকে ১০০ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের ডানার ওপরের অংশ উজ্জ্বল কমলা-বাদামি রঙের এবং কালো শিরা দ্বারা বিভক্ত। এদের ডানার প্রান্তজুড়ে কালো বর্ডারের ওপর সাদা ফোঁটার সারি এদেরকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ডানার নিম্নতল উপরিতলেরই অনুরূপ, তবে মূল রং অপেক্ষাকৃত ফ্যাকাশে। পুরুষ প্রজাপতির পেছনের ডানায় সাদা-কালো ফোঁটার উপস্থিতি থাকায় স্ত্রী ও পুরুষকে আলাদা করা যায়।
ডোরাকাটা বাঘ পরিযায়ী স্বভাবের প্রজাপতি। ঝোপঝাড়, হালকা বনাঞ্চল, গ্রামীণ পরিবেশ ও ফুলসমৃদ্ধ বাগান এদের প্রিয় আবাসস্থল। ফুলের মধু সংগ্রহের পাশাপাশি এরা দলবদ্ধভাবে বিশ্রাম নেয়। উপযুক্ত পরিবেশে সারা বছরই এরা সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এবং বৃষ্টিপ্রবণ পরিবেশে এদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এরা সাধারণত মাটির কাছাকাছি নিচ দিয়ে ওড়ে।
ডোরাকাটা বাঘ প্রজাপতির প্রজনন প্রক্রিয়াও বেশ চমকপ্রদ। স্ত্রী প্রজাপতি নির্দিষ্ট গাছের পাতার নিচে একটি করে ডিম পাড়ে। ক্রিম-সাদা বা রুপালি রঙের লম্বাটে আকৃতির এই ডিম হালকা হলদে বর্ণ ধারণের পর থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই ডিম ফোটে শূককীট বের হয়। শূককীট প্রথমে নিজের ডিমের খোসা খেয়ে ফেলে, এরপর পাতা খেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে। প্রায় এক মাসের জীবনচক্র শেষে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতিতে পরিণত হয় ডোরাকাটা বাঘ।
স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হুমায়ুন কবির বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে প্রজাপতিরা জড়িত। প্রকৃতি ছাড়া প্রজাপতি কল্পনাই করা যায় না। আবার প্রজাপতি ছাড়া প্রকৃতির সৌন্দর্য যেন ষোলোআনা পরিপূর্ণ হয় না। প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ আমাদের শেখায় সহাবস্থান, সংরক্ষণ এবং জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ।
তিনি বলেন, ডোরাকাটা বাঘের মতো সুন্দর প্রজাপতি শিশু-কিশোরদের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। তাই শিক্ষার্থীদের বইয়ের বাইরে প্রকৃতিকে জানার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবেশ শিক্ষার অংশ হিসেবে এসব প্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন কালবেলাকে বলেন, সৌন্দর্য প্রদর্শন করা প্রজাপতি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এরা জীববৈচিত্র্যেরও অংশ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, ডোরাকাটা বাঘ প্রজাপতি দেখতে বেশ লোভনীয় সুন্দর। প্রকৃতি ঘিরে এদের বিচরণ যে কাউকেই আকৃষ্ট করে। এদের ডানায় বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগের জন্যই এটি ডোরাকাটা বাঘ প্রজাপতি নামে বেশ পরিচিত।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ডোরাকাটা বাঘের মতো প্রজাপতিসহ অন্যান্য প্রজাপতিদের টিকে থাকার জন্য ফুলগাছ ও ঝোপঝাড় সংরক্ষণ জরুরি। এতে এদের আবাসস্থল সুরক্ষিত হবে। এছাড়াও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে পারলে এদের সংখ্যা আরও বাড়বে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।

