এভাবে রূপালি গিটার হাতে আর গান করতে দেখা যাবে না আইয়ুব বাচ্চুকে। ইচ্ছে ছিল, ১৫ লক্ষ দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে স্বপ্নের কনসার্ট করবেন এই রকস্টার। ঘণ্টা তিনেক ধরে কন্সার্টে একটা স্লট বাজাবে। সেখানে তাঁর সঙ্গে থাকবেন দেশ-বিদেশের শিল্পীরা । এ ছাড়াও আমেরিকান গায়ক-গিটারিস্ট স্টিভ ভাই, জো সাত্রানি, কার্লোস সান্তানা, ব্রিটিশ ড্রামার আয়েন পেজের, জেমস, বেজবাবা সুমন ও মানাম আহমেদ।অথচ পূরণ করতে পারেননি সেই স্বপ্নের কনসার্ট। সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান কিংবদন্তি এই শিল্পী। শারীরিকভাবে দূরে চলে গেলেও বাংলার সংগীতজগতে অমর হয়ে আছেন তিনি। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা আইয়ুব বাচ্চু কীভাবে হয়ে উঠলেন রক সংগীতের মুকুটহীন সম্রাট?১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নে বাবা ইসহাক চৌধুরী ও মা নুরজাহান বেগমের ঘরে জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। সম্ভ্রান্ত ও ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়টি শুরুতে কেউই মেনে নিতে পারেননি।
১৯৭৬ সালের দিকে বন্ধুর কাছ থেকে গিটার ধার নিয়ে বাজানো শুরু করেন আইয়ুব বাচ্চু। একসময় বন্ধুদের কাছ থেকে গিটার ধার করে বাজানো শেখা সেই ছেলেটিই হয়ে ওঠেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট।১৯৮৩ সালে পরিবারের অমতে সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে মাত্র ৬০০ টাকা ও প্রিয় গিটারটি সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। শুরুতে এলিফ্যান্ট রোডের সাধারণ এক হোটেলে থাকতেন। অর্থকষ্ট আর কঠোর পরিশ্রম পেরিয়ে একসময় গিটারের ঝংকারে মাতিয়ে তোলেন অগণিত তরুণ-তরুণী। ভক্তদের কাছে হয়ে ওঠেন ‘বস’। জনপ্রিয় ব্যান্ড এলআরবির দলনেতা ছিলেন তিনি। একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা ব্যান্ডজগৎ।
আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন এক স্বপ্নবাজ মানুষ। নিজে স্বপ্ন দেখেছেন, তা জয় করেছেন। আর স্বপ্ন দেখিয়েছেন তরুণদেরও। তাঁর দেখানো পথ ধরে, তাঁর উৎসাহে সংগীতে জায়গা করে নিয়েছেন অনেকেই। নামি-দামি গিটার সংগ্রহ করতে এবং বাজাতে ভালোবাসতেন আইয়ুব বাচ্চু। চেয়েছিলেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে, যেখানে ছেলে-মেয়েরা গিটারসহ যাবতীয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখবে। সেখান থেকে ব্যাচ হয়ে একক কিংবা ব্যান্ড বেরিয়ে আসবে, আর বাংলা গানে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখবে।
দুই চোখে স্বপ্ন জমা নিয়েই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে দূরে চলে যান এবি। আর কখনো মঞ্চে উঠবেন না এই কিংবদন্তি। তবে স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলেও মানুষের ভালোবাসার দিক থেকে এক ইঞ্চিও অপূর্ণতা ছিল না আইয়ুব বাচ্চুর। শিল্পী নেই, কিন্তু তার গিটারের ঝংকার আজও অমলিন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে যাবে আইয়ুব বাচ্চুর সুরের উত্তরাধিকার।

