নিজস্ব প্রতিবেদক:
রেনেটার জিএমকে ঘিরে টেন্ডার অনুমোদনে ‘বিশেষ সুবিধা’র অভিযোগ
স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় রেনেটা ফার্মাসিউটিক্যালসের জেনারেল ম্যানেজার কামরুল হাসান কেনেডির কথিত প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিএমএসডি এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিভিন্ন টেন্ডার ও ক্রয় প্রস্তাবের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব রয়েছে। এমনকি তাঁর সম্মতি বা তৎপরতা ছাড়া সংশ্লিষ্ট কিছু ফাইল এগোয় না এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
টেন্ডার অনুমোদনে রেনেটার ফাইল দ্রুত এগোনোর অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে খাবার বড়ি, ইনজেকশন,ইমপ্লান্ট ও কনডমসহ বিভিন্ন পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী ক্রয়ের একাধিক প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, একই সময়ে পাঠানো এসব প্রস্তাবের মধ্যে রেনেটা লিমিটেডের Oral Pill (POP) সংক্রান্ত টেন্ডারটি তুলনামূলক দ্রুত অনুমোদন পেয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, একই সময়ে পাঠানো অন্যান্য ক্রয় প্রস্তাবের ক্ষেত্রে এমন গতি দেখা যায়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইডিসিএল থেকে DPM পদ্ধতিতে কনডম ক্রয়ের প্রস্তাবও দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব ছিল।
আরও অভিযোগ রয়েছে, খাবার বড়ি ক্রয়ের চারটি দরপত্রের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও এর মধ্যে রেনেটার সংশ্লিষ্ট দুটি ফাইল দ্রুততার সঙ্গে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের কমিটির (CCGP) পর্যায়ে উঠেছে। অন্য দুটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একই ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মন্ত্রণালয়ের ক্রয় ও সংগ্রহ-সংক্রান্ত অধিশাখার কিছু কর্মকর্তা এসব ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তিতে সহযোগিতা করেছেন। অন্য কোম্পানির ফাইলের নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তাদের অনীহা রয়েছে তা তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। একই সময়ে পাঠানো একাধিক ক্রয় প্রস্তাবের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো কেন দ্রুত এগোচ্ছে-তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সারাদেশে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর এই সংকটের মধ্যে সনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এভাবে প্রভাব বিস্তারের ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ বিগত ১ মাস যাবৎ তাকে একাধিকবার দিনে মন্ত্রণালয়ে এবং রাতে মন্ত্রীর বাসভবনে যাতায়াত করতে দেখা যায়।
পুরোনো টেন্ডার বাতিল নিয়েও অভিযোগ
কেনেডিকে ঘিরে এর আগেও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বড় একটি ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৪৫ মিলিয়ন সাইকেল Oral Contraceptive Pill ক্রয়ের একটি টেন্ডার বাতিলের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল।
অভিযোগকারীদের দাবি, রেনেটা, বেক্সিমকোর সিস্টার কনসার্ন নাভিস্থ ফার্মা ওই ক্রয় প্রক্রিয়ায় কাজ না পাওয়ায় তৎকালীন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (উপকরণ ও সরবরাহ) জাকিয়া আখতার এবং মহাপরিচালক সাহান আরা বানুর সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে টেন্ডারটি বাতিল করা হয়েছিল। এর ফলে পরবর্তীতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয় বলে তাঁদের দাবি।
এই বিষয়ে তদন্ত হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি!
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
কামরুল হাসান কেনেডির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ প্রভাববলয়ের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ে ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁর দুই সন্তানকে অস্ট্রেলিয়া ও মালেশিয়াতে পড়াশোনা করানোর নামে অর্থপাচারের সঙ্গে তাঁর জড়িত থাকার কথা শোনা যায়। রেনেটা ফার্মাসিউটিক্যালস এর কর্মকর্তা পদে চাকরি করলেও তার একাধিক গাড়ি, বাড়ি,জাহাজ ও ফ্ল্যাট এর অর্থের উৎস নিয়ে সকলের মনে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর এতো সম্পত্তির বিষয়ে তারই প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে উল্লেখ করেন “কেনেডির কাছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস আছে নাহলে একই বেতনে চাকরি করে সে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেলেন কিভাবে?” তাকে গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদকের নজরদারি আনলে দেখা যাবে তিনি এখনো সন্ধার পর এসকল অন্যায় কাজ করার জন্য বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের বাসায় পড়ে থাকেন।
সংকটের সময়ে ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
সম্প্রতি দেশে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধে Vitamin-A-এর গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ অবস্থায় Vitamin-A ক্রয়ের কোনো প্রস্তাব বাতিল বা স্থগিত হয়ে থাকলে তার প্রশাসনিক ও কারিগরি কারণ প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের ভিটামিন-এ ক্রয়ের প্রস্তাব বাতিলে কেনেডির প্রভাব রয়েছে জানা যায়।
একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীসহ স্বাস্থ্য খাতের সব সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমান আচরণ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফাইল নিষ্পত্তি এবং e-GP ও সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির প্রভাবের অভিযোগ সত্য হলে তা নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত করা উচিত। কারণ বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মন্ত্রণালয়ে ফাইলের গতি নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠছে। পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর তীব্র সংকট সমাধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন দেয়ার পরও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ফাইল নিয়ে কেনো গড়িমসি তা উৎঘাটন করা উচিৎ বলে সকলের অভিমত।

