বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবারও যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধটি। একই সঙ্গে ই-পাসপোর্টের পাতা থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিভিন্ন স্থাপনার ছবি ও জলছাপ বাদ দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিসহ নতুন কিছু ছবি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি, জনমত এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশের নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল করা হচ্ছে।এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গত বছরের ৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি বহাল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে তৎকালীন সিদ্ধান্তটি কূটনৈতিক পাসপোর্টের বাইরে বড় পরিসরে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সব ধরনের পাসপোর্টে এটি শতভাগ কার্যকর করার চূড়ান্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ধাপে ধাপে কার্যকর হবে নতুন শর্ত
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে নতুন ই-পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শর্তটি প্রিন্ট করা হবে। তবে এতে পুরোনো পাসপোর্টধারীদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। বর্তমান পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবায়নের (রিনিউ) সময় নাগরিকেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট পেয়ে যাবেন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ই-পাসপোর্ট পরিষেবা চালুর সময় হঠাৎ করেই পাসপোর্ট থেকে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়া হয়। তৎকালীন সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর দেশজুড়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।
জলছাপ থেকে বাদ যাচ্ছে যা কিছু
চলতি মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পাসপোর্টের ভেতরের পৃষ্ঠার জলছাপ (Watermark) আমূল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের আমলে যুক্ত করা নির্দিষ্ট ব্যক্তি কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রতীকী স্থাপনাগুলো নতুন পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
বাদ পড়া ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, নৌকার ছবি, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ, মডেল মসজিদ, বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুনা সেতু), বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির এবং মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ।
নতুন পাসপোর্টে স্থান পাচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থান ও জাতীয় ঐতিহ্য
নতুন সংস্করণের ই-পাসপোর্টে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতি। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার সেই অবিস্মরণীয় ছবিটি স্থান পাচ্ছে পাসপোর্টের জলছাপে।
এছাড়া বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে নতুন করে যুক্ত করা হচ্ছে- ঐতিহাসিক বঙ্গভবন, জিআই পণ্য জামদানি শাড়ি, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, নৌকা ছাড়া কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, ঢাকার আহসান মঞ্জিল, কুমিল্লার শালবন বিহার, বান্দরবানের নীলগিরি, রাজশাহীর আমবাগান, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক পানাম নগরীর ছবি।
তবে আগের সংস্করণ থেকে জাতীয় ফুল শাপলা, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, দোয়েল পাখি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সুপ্রিম কোর্ট, শিখা অনির্বাণ, লালবাগ কেল্লা, হাতিরঝিল, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, কার্জন হল, ষাটগম্বুজ মসজিদ, সোনালি আঁশ পাট, চা-বাগান, সুন্দরবন এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’ অপরিবর্তিত থাকছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, পাসপোর্টের ভেতরের কিছু জলছাপ পরিবর্তন ও নতুন ছবি যুক্ত করার কাজ প্রক্রিয়াধীন। দ্রুতই এ বিষয়ে সরকারপ্রধানের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যাবে এবং এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন পাসপোর্ট মুদ্রণ শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শর্ত পুনর্বহাল এবং জলছাপের এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীকী পুনর্বিন্যাসের একটি বড় অংশ।

