ইটিসি নিউজের বৈশাখী আয়োজনে প্রকাশিত হলো কবি মজিদ মাহমুদের একগুচ্ছ কবিতা-
একগুচ্ছ কবিতা
মজিদ মাহমুদ
বাঙ্কার
মাটির নিচে কেউ কাজ করছে—
নিস্তব্ধ, ধৈর্যশীল, প্রায় অদৃশ্য।
পৃথিবীর দেহে বসানো হচ্ছে লোহার শিরা,
কংক্রিট জমাট বাঁধছে—
এক বৃদ্ধ হৃদয়ের শেষ আশ্রয়।
উপরে—
আলো, সংগীত, নৃত্য।
ঝাড়বাতির নিচে শরীর ঘোরে,
লাস্যমীদের হাসির রিহার্সাল,
যেন পৃথিবীর কিছু হয়নি।
তবু প্রতিটি নৃত্যশিল্পীর বুকে
একটি গোপন কম্পন—
বুলেটপ্রুফ কাপড়ে মোড়া ভয়।
তারা জানে—
মাটি কখনো নিরপেক্ষ নয়।
নিচে—বাঙ্কার,
সামরিক শ্বাসে ভরা এক কিম্ভূতাকার প্রাণী।
বোমা ঠেকানোর দেয়াল,
রক্ত সামলানোর ঘর,
জীবন ধরে রাখার যন্ত্র—
সব প্রস্তুত,
শুধু সময় তার পক্ষে নয়।
গোপন তারে বার্তা ছুটে যায়—
বিশ্ব অস্থির,
সীমান্ত কাঁপে,
মানচিত্রের ভেতর ফাটল ধরে।
এই সবকিছুর কেন্দ্রে
এক রাজা বাঁচানোর খেলা।
উপরে বলরুম—
একটি আচ্ছাদন মাত্র,
স্বচ্ছ কাচে মোড়া ভয়ের প্রাসাদ,
যেখানে সৌন্দর্য মানে
নিরাপত্তার অভিনয়।
কাঁচের অপারে মানুষ
শুনছে এক বৃদ্ধ রাজার প্রশ্বাস:
আরও কিছুদিন,
আরও কিছু শ্বাস,
আরও কিছু সময়—
মৃত্যুকে দরজার বাইরে আটকে রাখার চেষ্টা।
কিন্তু ইতিহাস ধীরে ফিসফিস করে—
হিটলারেরও ছিল বাঙ্কার,
গভীর, দুর্ভেদ্য, অন্ধকার—
শেষ পর্যন্ত
মাটিই তাকে খেয়েছিল।
শেষ দৃশ্য—
সেনারা আসে,
কফিন বহন করে।
নৃত্য থামে না—
এই লাশই রাজ্যভিষেকে প্রস্তুত।
আকাশে মেঘ জমে,
অন্ধকার ঢুকে পড়ে
সবচেয়ে সুরক্ষিত ফাঁক দিয়েও।
আর তখন—
সব তার, সব সংকেত, সব প্রাচীর ভেদ করে
একটি সত্য ঝনঝনিয়ে ওঠে:
রাজা বাঁচতে চেয়েছিল—
কিন্তু বাঙ্কার জানত,
এটাই তার শেষ ঘর।
সংখ্যা শক্তি নয়
ভাঙা ভিড়, দিশাহীন স্রোত,
অসংখ্য গলা ফেটে চিৎকার করে,
তবু দাঁড়িয়ে থাকে নিথর জগদ্দল মতো।
তুমি উড়ো—ভাবো নিজেকে মুক্ত,
আকাশ তোমার, স্বপ্নও তারা,
অদৃশ্য সুতোয় টানে অচেনা হাত,
নাটাই যার—ইশারাও তারই সারা।
কয়েকটি মুখ, কয়েকটি নাম—
পৃথিবী জুড়ে তাদেরই রাজ,
রক্তে লেখা ইতিহাস জানে—
অল্পের হাতেই অধিকের লাজ।
এই মাটিতেই, একদিন শাদা অল্প
নত করেছিল কোটি মানুষের মাথা,
সংখ্যা নয়—সংগঠনের আগুনেই
গড়ে ওঠে ক্ষমতার ব্যথা-গাথা।
আজও সেই খেলা থামে না কোথাও—
সম্পদ বন্দী মুষ্টিমেয়ের ঘরে,
অসংখ্য মানুষ শব্দ হয়ে ভেসে যায়
ক্ষমতার বধির উচ্চস্বরে।
নিন্দা ও প্রশংসা
নিন্দা ও প্রশংসায় বিচলিত হয়ো না—
যে নিন্দা করত, সে আজ প্রশংসা করে,
আর প্রশংসাকারীরা লিখে চলে
নিন্দার কাসিদা।
নিন্দা স্থির নয়,
প্রশংসাও নয়—
দুটোই অস্থির জনতার
দুই দিকের মুখ।
সক্রেটিস, যিশু—
নিজ নিজ কালে
নিশ্চয়ই উচ্ছৃখল, দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ ছিলেন;
নইলে ইতিহাস
এত দেরিতে ক্ষমা চাইত না।
গান্ধীকেও তো
গডসের গুলি
প্রশংসার মধ্যেই খুঁজে নিয়েছিল।
যে আজ প্রশংসা করে
সে-ই কাল তোমার নিন্দাকারী;
এই চক্র ভাঙে না।
তাই নিন্দা কিংবা প্রশংসা—
যে কাউকে সঙ্গে রাখো,
দুজনেই তোমার
যুগল নিরাপত্তা।
মৃত্যু
মানুষ মরে যাওয়াকে ভয় করে,
মরার চিন্তায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
প্রতিদিনের মৃত্যু দেখে
নিজেও একটু একটু করে মরে যায়।
সে ছিল না, সে এখন আছে—
সে হাঁটতে পারত না,
কথা বলতে পারত না,
মিলিত হতে পারত না।
দাড়ি ছিল না, গোঁফ ছিল না,
সাদা চুল ছিল না—
এই সব পরিবর্তনই যেন
মরে যাওয়ার আরেক নাম।
তুমি নিজের জীবনে
অনেকবার মরে যাও,
প্রতি মুহূর্তে মরতে থাকো।
তুমি কখনোই এক লোক নও।
আর যেদিন একেবারে মরে যাবে,
সেদিন সবাই দেখতে পাবে—
তুমি ছাড়া।
যে চূড়ান্ত মৃত্যুকে
তুমি নিজে দেখতে পাবে না,
তার জন্য অহেতুক ভেবো না।

