নবীজি (সা.) যখন সর্বপ্রথম মদিনায় গমন করেন তখন মানুষজন চর্তুদিক থেকে তাকে দেখতে এলেন, সে সময় তিনি মানুষের উদ্দেশ্য যে নসিহত পেশ করেছিলেন। তা ছিল ৪টি উপদেশে ভরপুর। এটিই ছিলো ইসলামের প্রথম চারদফা কর্মসূচি ঘোষণা। সেই কর্মসূচিগুলো কী ছিল?হাদিসে পাকে এসেছে—عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَلَامٍ قَالَ: لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الْمَدِينَةَ، انْجَفَلَ النَّاسُ إِلَيْهِ، وَقِيلَ: قَدْ قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ، قَدْ قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ، قَدْ قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ، فَجِئْتُ فِي النَّاسِ لِأَنْظُرَ إِلَيْهِ، فَلَمَّا اسْتَبَنْتُ وَجْهَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ، عَرَفْتُ أَنَّ وَجْهَهُ لَيْسَ بِوَجْهِ كَذَّابٍ، وَكَانَ أَوَّلَ شَيْءٍ تَكَلَّمَ بِهِ أَنْ قَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصِلُوا الْأَرْحَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ.হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এলেন, লোকেরা তাকে দেখার জন্য ছুটে যাচ্ছিল এবং বলছিল, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) এসেছেন!’ ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) এসেছেন!’ ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) এসেছেন!’আমিও সবার সঙ্গে তাকে দেখতে গেলাম। তার চেহারা ভালোভাবে দেখে আমি বুঝতে পারলাম, এটা মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়।সর্বপ্রথম তার মুখে আমি যা শুনেছিলাম, তিনি বলেছিলেন— ‘ হে লোকসকল! তোমরা সালামের ব্যাপক প্রচলন করো, খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় করো, তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (ইবনে মাজাহ ১৩৩৪)হাদিসে ঘোষিত চারদফা কর্মসূচি—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই ভাষণ থেকে তার মানসিকতা ও দর্শন বোঝা যায়। তিনি প্রথমেই বলেননি সবাই জিকির করো। প্রথমেই বলেননি মেয়েরা সবাই পর্দা করো, মাথায় কাপড় দাও। বরং তিনি প্রথমেই বলেছেন শান্তির পয়গাম পৌঁছে দাও।তিনি তখন সবেমাত্র মদিনায় এসেছেন। মদিনার ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তিনি সংস্কার করবেন। ওই সময় যে কথাটা বলেছিলেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কেউ বড় দায়িত্বে আসীন হলে প্রথম কথাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)ও জাতির উদ্দেশ্যে ওই সময় যে কথাগুলো বললেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি চার দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন।প্রথম কর্মসূচি—প্রথমে বলেছেন শান্তির পয়গাম পৌঁছে দাও। এর মানে তিনি ছিলেন শান্তিপ্রিয়। তিনি অশান্তি পছন্দ করতেন না। সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁর লক্ষ্য।তিনি আজীবন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন। মদিনায়ও তিন ধর্মের লোকদের সঙ্গে নিয়ে শান্তিচুক্তি করেছেন। মক্কার মুশরিকদের সঙ্গেও তিনি শান্তিচুক্তি করেছেন। মদিনায় পৌঁছেই তার প্রথম কথা ছিল শান্তির বাণী পৌঁছে দাও। কারণ মদিনায় হিজরতের পাঁচ বছর আগে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ হয়েছিল আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে যা বুআস যুদ্ধ নামে পরিচিত। সেই যুদ্ধের পর মদিনার সমাজ ছিল ভঙ্গুর। তাই প্রথম কাজ ছিল সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।দ্বিতীয় কর্মসূচি—এরপর বললেন মানুষকে খাবার খাওয়াও। খাদ্য সংকট দূর করো। খাদ্যদ্রব্য মানুষের নাগালে নিয়ে আসো। মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দাও। আগে তো পেট ঠিক থাকতে হবে। আরবরা বলে, কারো হৃদয়ে পৌঁছতে হলে আগে তার পেটে পৌঁছতে হয়। তাই শান্তির কথা বলার পরই রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, খাদ্য সমস্যা দূর করো।তিনি বললেন, খাদ্যের সংকট দূর করো, ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দাও। সমাজের মানুষের প্রতি যত্ন নাও। অনাহারীর মুখে খাবার পৌঁছে দাও। এটি ছিল দ্বিতীয় কর্মসূচি।
তৃতীয় কর্মসূচি—আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত করা। তিনি বললেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করো। নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করলে শান্তি থাকবে না। তাই আত্মীয়তার বন্ধনকে শক্ত করো।চতুর্থ কর্মসূচি—সব শেষে বললেন নামাজের কথা। আমরা সাধারণত কারো সাথে দেখা হলে প্রথমেই বলি নামাজ পড়েন, দাড়ি রাখেন, টুপি দেন, বোরকা পরেন। এসব কঠিন কথা বলে মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দিই। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে বললেন শান্তি প্রতিষ্ঠা করো, তারপর খাদ্য নিশ্চিত করো, তারপর আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করো। সব শেষে বললেন আধ্যাত্মিক উন্নয়ন— নামাজের কথা।তিনি বললেন, যখন সবাই ঘুমায়, তুমি ঘুমিয়ে যেও না। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদো। রবের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করো।এই চারটি কাজ—শান্তি প্রতিষ্ঠা, খাদ্য সংকট দূরীকরণ, আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ়করণ এবং নামাজের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উন্নয়ন—যে করবে, সে সহজেই আল্লাহর জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুবহানাল্লাহ! কতই না সুন্দর আহ্বান! যা মদিনার নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

