যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দোষারোপ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর চাপ না বাড়িয়ে জেলেনস্কির বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি।
ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজের ইউরোপবিষয়ক সম্পাদক মারিয়া তাদেও তার সাপ্তাহিক বিশ্লেষণে এমন মত দিয়েছেন।গত সপ্তাহে রাশিয়ার ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মার্কিন সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতে রাশিয়া বাড়তি আয় করার সুযোগ পাচ্ছে, অথচ এর বিনিময়ে মস্কোকে যুদ্ধ বন্ধে কোনো শর্ত মানতে হচ্ছে না বলে মনে করেন তাদেও। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন রাজনৈতিক চাপে রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাদেওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সংকটের দ্রুত সমাধান না পেয়ে ট্রাম্প ইউক্রেনের দিকে দোষ চাপাচ্ছেন।ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, জেলেনস্কির কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, খামারি ও বিশ্ববাসী সমস্যায় পড়ছেন। তিনি এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, জেলেনস্কি শান্তির কথা বললেও বাস্তবে তার বিপরীত কাজ করছেন এবং ইউক্রেনের নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। তাদেওর মতে, প্রতিদিন রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে থাকা একটি দেশের প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে এমন বক্তব্য দেওয়া অস্বাভাবিক। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ট্রাম্প কখনো একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।তবে জেলেনস্কির কৌশল, কূটনৈতিক ভুল এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবু রাশিয়ার দখলে থাকা ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়ে দ্রুত শান্তিচুক্তি করার বিষয়ে জেলেনস্কির অনড় অবস্থানকে যৌক্তিক মনে করেন তাদেও। তার মতে, বিষয়টি শুধু ভূখণ্ডের নয়; ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
তাদেওর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে পুতিনকে আলোচনায় ফেরানোর যে কৌশল যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, তা রুশ প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। ২০২১ সালে পুতিন এক প্রবন্ধে রুশ ও ইউক্রেনীয়দের একই জাতি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাদেওর মতে, ইউক্রেনের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার লড়াইয়ের বিষয়টি বুঝতে হলে এই দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এদিকে, ইউক্রেনের জন্য সামরিক ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে শুক্রবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলেনস্কি। রাশিয়ার হামলায় দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শীতের আগে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নতুন অর্থায়ন এখন কিয়েভের জরুরি প্রয়োজন।
জেলেনস্কি ইউরোপীয় নেতাদের জানিয়েছেন, ২০২৭ সালে যুদ্ধ চালাতে ইউক্রেনের প্রায় ১৫৫ বিলিয়ন ইউরো প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে ৭০ বিলিয়ন ইউরো ইউরোপীয় দেশগুলোকে জোগান দিতে হতে পারে। কিন্তু ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইউক্রেনকে সহায়তা নিয়ে জনমত ও রাজনৈতিক আপত্তি বাড়ছে।
ফ্রান্সের মেরিন লে পেন বলেছেন, তার দেশ আর ইউক্রেনের জন্য যৌথ তহবিলে অর্থ দিতে পারবে না। জার্মানির উগ্র ডানপন্থি দল এএফডিও ইউক্রেনকে সহায়তা কমানোর পক্ষে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ সদস্য এখনো এ অবস্থান সমর্থন করে না, তবু অর্থনৈতিক চাপ ও যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্তি ইউক্রেনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় নেতারা ইউক্রেনের দুই বছরের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ অনুমোদন করেছিলেন। কিন্তু এখন সেই অর্থও যথেষ্ট হবে না বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনকে আগামী নভেম্বরের মধ্যে অর্থের ঘাটতি পূরণের উপায় খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। নতুন ঋণ নেওয়া কিংবা জব্দ করা রুশ সম্পদ ব্যবহারের মতো প্রস্তাব আলোচনায় থাকলেও কোন পথে অর্থ জোগাড় হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তাদেওর মতে, ইউক্রেনকে যুদ্ধে টিকে থাকতে সহায়তা করা কিংবা রাশিয়াকে সুবিধা করে দেওয়ার মধ্যে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে ইউরোপ। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ, সামরিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিশ্চিত করার পথ এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্র: ইউরোনিউজ

