রাজধানীর অভিজাত ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৫২ নম্বর (পুরাতন)/৭১ নম্বর (নতুন), সড়ক ১২/এ প্লট। এক বিঘা আয়তনের প্লটটির বাজারমূল্য বর্তমানে শতকোটি টাকারও বেশি। এক পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন এই প্লটের মালিক। স্বাধীনতার পর ওই পাকিস্তানির মৃত্যু হলে তার স্ত্রী দেশ ত্যাগ করেন। নিয়ম অনুসারে এই সম্পত্তি সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় চলে যায়। কিন্তু সরকারি নথিতে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকার কথা থাকলেও গেজেট প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা ও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য বাধা তৈরি হয়। সেই ফাঁকেই গড়ে ওঠে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট, যেখানে কিছু ব্যবসায়ী ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যুক্ত আছেন। আমমোক্তার দলিল, আপস-মীমাংসা আর প্রভাবের ছায়ায় ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিত্যক্ত ঘোষিত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় যাওয়ার সুযোগ নেই। তবু ধানমন্ডির এক বিঘার প্লটটি ঘিরে যে নাটকীয়তা, তা রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের এক উদ্বেগজনক নজির হয়ে উঠেছে। দীর্ঘসময়েও কোনো গণতান্ত্রিক সরকার এই সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় দেয়নি; কিন্তু গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছায়ায় গড়ে ওঠা একটি বিশেষ সিন্ডিকেট জমিটি অবমুক্ত করে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করেন।
তথ্য বলছে, নিয়ম অনুযায়ী বাড়িটি সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় থাকার কথা। তালিকাভুক্ত থাকলেও গত ৫৫ বছরে এর গেজেট প্রকাশ হয়নি। সেই সুযোগে একাধিক পক্ষ বাড়িটির মালিকানা নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। বিভিন্নভাবে মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলাও করা হয়।নথিপত্র বলছে, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৫২ নম্বর (পুরাতন)/৭১ নম্বর (নতুন), সড়ক ১২/এ-এর এক বিঘা জমির মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ কাজেম বেয়াদ। স্বাধীনতার আগে তিনি সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সে (সিআরপিএফ) কর্মরত ছিলেন। তিনি ইরানি নাগরিক শহরবানু জেওয়ার সুলতানকে বিয়ে করেন। স্বাধীনতার পর কাজেম বেয়াদের মৃত্যু হলে তার স্ত্রী লন্ডনে চলে যান। যাওয়ার সময় বাড়িটির দেখভালের দায়িত্ব দেন ভাড়াটিয়া বেগম ওয়াহিদা খানমকে। দীর্ঘদিন মালিক দেশে না ফেরায় এবং নিজে ভোগদখলে থাকায় ওয়াহিদা খানম বাড়িটির মালিকানা দাবি করেন। তার দাবি, ১৯৭৩ সালে শহরবানু জেওয়ার সুলতান বেয়াদের সঙ্গে তার বিক্রয়চুক্তি ও বায়না সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালে লন্ডন দূতাবাসের মাধ্যমে শহরবানুর কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার দাবি করেন হামিদউদ্দিন আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। যদিও কালবেলার অনুসন্ধান বলছে, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার যে কাগজ দেখানো হয়েছে, সেখানে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তবে অনেক চেষ্টা করেও শহরবানুর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। এমনকি বর্তমানে তিনি জীবিত নাকি মৃত, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যদিও আইন অনুযায়ী পরিত্যক্ত সম্পত্তির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সেই আমমোক্তার দলিলের ভিত্তিতে বাড়িটির মালিকানা দাবি করেন হামিদউদ্দিন। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব চলার পর মামলা হয়। মামলা চলমান থাকাকালেই মন্ত্রণালয় এবং প্রভাবশালী একজন ব্যক্তির মধ্যস্থতায় দুপক্ষ সমঝোতায় পৌঁছায়। এরপর প্রতি পদে পদে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সম্প্রতি মূল্যবান এ জমিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়া হয়।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিবরা বলছেন, যেসব পাকিস্তানি বা বিদেশি নাগরিক স্বাধীনতার পর দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, আইন অনুযায়ী তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অধীনে ন্যস্ত হওয়ার কথা। এসব সম্পত্তির বৈধ ব্যক্তিগত মালিকানা থাকার সুযোগ নেই। ফলে কোনো ব্যক্তির এ ধরনের বাড়ি বা জমির মালিকানা দাবি করা আইনের পরিপন্থি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাষ্ট্র চাইলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।
আবু তাহের আল মামুন নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি কালবেলাকে বলেন, আমি ক্রয়সূত্রে এই জমির মধ্যে ১০ কাঠার মালিক। কিন্তু হামিদউদ্দিন আহমেদ নামের জনৈক ব্যক্তি এই জমির মালিকানা দাবি করছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়া রয়েছে। কেউ এই জমি আপাতত বিক্রি করতে পারবে না।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, বিষয়টি আমি জানতাম না। পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়ার সুযোগ নেই। অবশ্যই বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অবমুক্ত করা হলেও তা বাতিল করে ফের পরিত্যক্ত তালিকায় নেওয়া হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর কালবেলাকে বলেন, আমরা যেহেতু নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। তাই বিষয়টি জানি না। তবে খবর নিয়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

