রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়। এটি মানুষের সম্মিলিত জীবনব্যবস্থার নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংগঠন। ‘রাষ্ট্র কী, কেন এবং কার জন্য’ এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক দর্শনের সূচনালগ্ন থেকেই আলোচিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্র কি কেবল নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিষ্ঠান, নাকি নাগরিকের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব? ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এই প্রশ্নের উত্তর ভিন্নভাবে দেওয়া হয়েছে।
প্রাচীন গ্রিসে দার্শনিক প্লেটো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দি রিপাবলিকে যে আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা উপস্থাপন করেন, তা রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে এক মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করে। অপরদিকে আধুনিক যুগে শিল্পবিপ্লব, গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ এবং মানবাধিকারের প্রসারের মধ্য দিয়ে কল্যাণ রাষ্ট্র ধারণার উদ্ভব ঘটে, যা রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতাকে নতুন মাত্রা দেয়।প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র : ন্যায়, শৃঙ্খলা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়
প্লেটোর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘ন্যায়’। তার মতে, ন্যায় কেবল আইনি কাঠামোর বিষয় নয়; এটি নৈতিক ও সামাজিক সামঞ্জস্যের অবস্থা। তিনি বলেন, প্রত্যেকে যদি তার স্বভাবসিদ্ধ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এবং অন্যের কর্মক্ষেত্রে অযথা হস্তক্ষেপ না করে, তবে রাষ্ট্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। দায়িত্ববণ্টনের সুশৃঙ্খল প্রয়োগই তার ন্যায়তত্ত্বের ভিত্তি।
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, স্বচ্ছ অর্থনৈতিক নীতি এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা।
প্লেটোর রাষ্ট্রে শিক্ষার ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও টেকসই উন্নয়নের জন্য তা সমানভাবে অপরিহার্য। দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি সম্ভব নয়।
আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তি নাগরিক অংশগ্রহণ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও চর্চাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
বলা যায়, প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র নৈতিক ও প্রজ্ঞাভিত্তিক শাসনের কল্পরূপ, যেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠাই মুখ্য লক্ষ্য। আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র সেই ন্যায়কে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দুই ধারণার সৃজনশীল সমন্বয় জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা সহজ হবে এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। প্রাচীন দর্শন স্মরণ করিয়ে দেয়, জ্ঞান-নৈতিকতা ও সুশাসনের সমন্বয় ছাড়া প্রকৃত কল্যাণ অর্জন সম্ভব নয়। তাই ন্যায়ভিত্তিক আদর্শ ও মানবিক কল্যাণের সমন্বয়ই হতে পারে একটি শক্তিশালী, ন্যায়নিষ্ঠ ও টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি।
লেখক : মায়মুন শরীফ রাইয়ান, সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড মডেল কলেজ

