চলতি মৌসুমের শুরুতে গাছে গাছে মুকুলের সমারোহ দেখে আশার আলো দেখেছিলেন রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষিরা। বাগানজুড়ে সোনালি মুকুল যেন ভালো ফলনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশা অনেকটাই হতাশায় পরিণত হয়েছে।এখন অনেক বাগানেই আশানুরূপ আম নেই। খরা, অনিয়মিত আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় গাছ থেকে ঝরে পড়েছে আমের গুটি। এতে করে উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। সেখানে অনেক বাগানেই আমের উপস্থিতি বেশি থাকলেও বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েই গেছে।
নওগাঁর আমচাষি হাফিজুর রহমান বলেন, মৌসুমের শুরুতে যে পরিমাণ মুকুল এসেছিল, তাতে ভালো ফলনের আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই হিসাব মিলছে না। বাজারে সঠিক তদারকি না থাকলে কৃষক থেকে শুরু করে বাগান মালিক সবাই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে।রাজশাহী পবা উপজেলার চাষি রাসেল বলেন, খরার কারণে গাছে আম টিকিয়ে রাখা যায়নি। কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেব, বুঝতে পারছি না।রাজশাহীর বাঘ উপজেলার আমচাষি দোলা জানান, শুরুতে বাম্পার ফলনের আশা থাকলেও এখন গাছে অর্ধেকেরও কম আম রয়েছে। প্রতিদিনই আম ঝরে পড়ছে। সার, কীটনাশক, সেচসবকিছুর খরচ বেড়েছে, কিন্তু ফলন কমে গেছে। এতে আমরা দিশেহারা।
গোদাগাড়ী উপজেলার চাষি আজমত আলী বলেন, আম বাঁচাতে সব ধরনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু পানি সংকটের কারণে অনেক গাছে ঠিকমতো ফল ধরেনি। এখন যদি বাজারে ভালো দাম না পাই, তাহলে ঋণ শোধ করাই কঠিন হয়ে যাবে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ৯৯ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ থেকে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।
গত কয়েক বছর ধরেই একের পর এক সংকটে পড়ছেন এ অঞ্চলের আমচাষিরা। করোনার প্রভাব কাটার আগেই খরা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মৌসুমে দীর্ঘ ঈদ ছুটির কারণে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা সব মিলিয়ে লোকসানের চক্র থেকে বের হতে পারছেন না তারা। এবার লাভের আশা জাগলেও তা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মোহনপুর আম ব্যবসায়ী সরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতি মণ আম যদি দুই হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়, তাহলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু অনেক সময় হাটে নিয়ে গিয়ে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। এতে হতাশ হয়ে কেউ কেউ বাগান কেটে ফেলছেন।
এদিকে আর কয়েকদিনের মধ্যেই রাজশাহী ও আশপাশের জেলাগুলোতে পাকা আম বাজারে আসতে শুরু করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও বাজারজাত ঠেকাতে নজরদারি জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, অপরিপক্ব আম যাতে আগেই সংগ্রহ না করা হয়, সে জন্য নির্ধারিত সময়সূচি দেওয়া হবে। কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়েও আমরা কাজ করছি। তিনি জানান, আম সংরক্ষণের বিকল্প পদ্ধতি যেমন আমসত্ত্ব, চিপস, জ্যাম ও জেলি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, কৃষকদের নিজস্ব উদ্যোগে আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে বাজারদর কমে গেলেও তারা বিকল্প উপায়ে লাভবান হতে পারবেন।
মুকুল আসার আগ থেকেই চাষিরা গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকে সেচ দেওয়া, কীটনাশক প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি সবই করেছেন তারা। তারপরও প্রকৃতির প্রতিকূলতায় অনেক বাগানে আশানুরূপ ফলন আসেনি। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন বাগান মালিকরা। তবে এখনো গাছে যে পরিমাণ আম রয়েছে, তা যদি ভরা মৌসুমে ভালো দামে বিক্রি করা যায়, তাহলে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শেষ পর্যন্ত বাজারদরই নির্ধারণ করবে মৌসুমে রাজশাহীর আমচাষিদের মুখে হাসি ফুটবে, নাকি হতাশাই বাড়বে।

